দেশে এখন চলছে পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। এক শতাংশের কম সুবিধাভোগীদের সুবিধা দিতেই অর্থনীতির নানা নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। ফলে অর্থনীতি এখন সাধারণ নিয়মাচারের বাইরে চলে গেছে। আইনের শাসন নেই বলে ব্যাংক খাতে এত চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সংলাপে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেছেন সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সংলাপে অংশ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘বর্তমান সরকার সুশাসনের ভিত্তিতেই দেশ পরিচালনা করছে। আইনের বাইরে আমরা কিছু করছি না। কারও যদি মনে হয় আইনের বাইরে কিছু করছে, তাহলে তাঁরা আদালতে যেতে পারেন।’
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল রোববার সিপিডির প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের ওপর এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। সংস্থাটির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর, ইংরেজি দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক শামসুল হক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি সামির সাত্তার, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আকতার।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘গত ৩০ বছরে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কাঠামোগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। এটি বন্ধ না করে সরকার পাচারকারীদের জন্য উল্টো প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে।
জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় এসব নিয়ে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। দেশে চলছে এখন পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। যারা সরকারকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করছে, সহায়তা করছে, তারাই এসব সুবিধা পাচ্ছে। আমরা দেখলাম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অপব্যবহার করা হয়েছে। রিজার্ভে অর্থে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ গঠন করা হলো। সেখান থেকে সরকারের সুবিধাভোগীরা ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। যারা অর্থ পাচার করল, সেসব পাচারকারীর জন্য আবার প্রণোদনা সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে।’
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের খুব বেশি ভূমিকা থাকে না। শুধু সংসদ সদস্য নয়, মন্ত্রী থাকার সময় দেখেছি, বাজেট প্রণয়নপ্রক্রিয়ায় অনেক মন্ত্রীরও কোনো ভূমিকা থাকে না। অনেকে মনে করেন, বাজেট প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা থাকে, সেটি শুনতে আমাদেরও ভালো লাগে। বাস্তবে আমাদের কিছু করার থাকে না। হয়তো সংসদে কিছু বলার সুযোগ আছে।’
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আরও বলেন, ‘ব্যাংক ও আর্থিক খাতে এখন আইনের শাসনের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংক খাতে এত বড় বড় চুরি-ডাকাতি হলো, কিন্তু কারও কোনো শাস্তি হলো না। যদি অপরাধের শাস্তি না হয়, তাহলে অপরাধ ঘটতেই থাকবে। বাজেটে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দেওয়া। মেগা প্রকল্পের এখন তেমন কোনো দরকার নেই। কিন্তু বাজেটে আমরা বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ দেখলাম না। সরকার বলছে, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে শিল্পের স্বার্থে। কিন্তু আসলে এ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে অদক্ষতা ও চুরির কারণে, শিল্পের প্রয়োজনে নয়।’
জাতীয় পার্টির এই নেতা আরও বলেন, ‘এখন আমরা আইএমএফের শর্ত পূরণে অনেক কিছু করছি। কিন্তু আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছে, সেগুলো আমাদের দেশের গবেষক, অর্থনীতিবিদসহ দেশের অনেকেই অনেক দিন ধরে বলে আসছিল। কিন্তু আমরা তাদের কথা শুনিনি, কিছু করিনি।’
সংলাপে বক্তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানান। বক্তাদের এসব উদ্বেগের বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, এটা আমরা স্বীকার করছি। আমরাও চেষ্টা করছি এ সমস্যার সমাধানে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে আমরা নিম্ন আয়ের মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা করছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে নিম্নবিত্ত পর্যায়ের ৩০ শতাংশ মানুষের কষ্ট কমানো। এ জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা নিয়েছি।’ চলমান বিদ্যুৎ সমস্যা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের অবস্থা আগে ভালো ছিল। মাঝখানে খারাপ হয়েছে। এখন আবার স্থিতিশীল হচ্ছে।
মূল প্রবন্ধে ফাহমিদা খাতুন প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সিপিডির ১০টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
এ বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেট অনেক আশাবাদী হয়েছে। কিন্তু চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কোনো স্বীকৃতি সেখানে নেই।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি মো. সামীর সাত্তার বলেন, চলতি বছরটি রক্ষণশীল বিনিয়োগের বছর। ফলে এখন বিনিয়োগ কম হলেও কর্মসংস্থান না কমিয়ে ব্যবসায় টিকে থাকাটাই ইতিবাচক দিক হবে।
মূল প্রবন্ধে ফাহমিদা খাতুন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে বাজেটে কোনো উদ্যোগ নেই। বরং কিছু পদক্ষেপ ভোক্তাদের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।
সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর পরিবর্তে বরং সেটিকে উসকে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বাজেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। এর পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় কারণ রয়েছে। তবে সত্য কথা হচ্ছে, আমরা মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করার জন্য চেষ্টা করছি।’
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক শামসুল হক বলেন, দেশের শেয়ারবাজার এখন স্থবির। বাজেটে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বর্তমানে শেয়ারবাজারে সর্বনিম্ন মূল্যস্তর বা ফ্লোরপ্রাইস রয়েছে, সেটি তুলে নেওয়া হলে বাজারে ধস নামতে পারে।
এ বিষয়ে শামসুল হকের কাছে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চান, সরকারি লাভজনক কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছেড়ে সরকার সেখান থেকে অর্থসংস্থান করতে পারে কি না। জবাবে শামসুল হক বলেন, সরকার এটাতে খুব বেশি আগ্রহী হবে বলে মনে হয় না। কারণ, অনেক আমলা এটি চান না। তাঁরা সরকারি লাভজনক কোম্পানিগুলোর পর্ষদে রয়েছেন। তাই সরকার উদ্যোগ নিলেও আমলারা এ ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করবে।
গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। শ্রমজীবী মানুষের ওপর তার চাপ সবচেয়ে বেশি। তাই বাজেটে পোশাকশ্রমিকসহ শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা দরকার। একই সঙ্গে তিনি পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আরশাদ জামান বলেন, চলমান সংকটে অনেক পোশাক কারখানা চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করতে হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে বেতন বাড়ানোটাও সময়ের দাবি। এ অবস্থায় তিনি ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব করেন।
জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম বলেন, বাজেটের কারণে সবচেয়ে বেশি অভিঘাত পড়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে। ফলে বর্তমানে জ্বালানির দাম নির্ধারণে একধরনের লুণ্ঠনমুখী পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সমস্যা ভয়ংকর অবস্থায় চলে গেছে। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান সবই কমবে।
বাজেটে প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মো. মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, ৩০টা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দিয়ে সংকট সমাধানের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী আরও বলেন, তিতাস গ্যাসে চুরি নয়, রীতিমতো ডাকাতি হচ্ছে। এসব ডাকাতি বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘সরকার বিদ্যুতের বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না করে অন্য বৃহৎ প্রকল্পে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এখন সরকারের অদক্ষতার মাশুল আমাদের দিতে হচ্ছে।’
নতুন আয়কর আইনে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওসহ ব্যবসায় সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে কোম্পানিভুক্ত করা হয়েছে। তাতে অনেকের ওপর বাড়তি করের চাপ তৈরি হবে। এই সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সিপিডি।
সরকারের এ সিদ্ধান্ত শিক্ষাবান্ধব নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক শারমিন মুরশিদ বলেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে এগিয়ে নিচ্ছে এনজিও খাত। অথচ সরকার তাদের পুরস্কৃত না করে চাপ তৈরি করছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘এনবিআরের খাতায় একবার নাম উঠলে কী হবে, তা তো আমরা বুঝি।’
সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, যে প্রক্রিয়ায় এখন বাজেট তৈরি হচ্ছে, তাতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে গেছে। বাজেট এখন তৈরি হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এসিআইয়ের চেয়ারম্যান আনিস উদ দৌলা, সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল প্রমুখ।