
আগামী অর্থবছরের জন্য কম ব্যয়ের বাজেট করার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে ও রক্ষণশীলভাবে। কারণ, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, একদিকে আছে যুদ্ধের প্রভাব ও বৈশ্বিক অস্থিরতা, অন্যদিকে আছে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থের অভাব। তাই খরচের ক্ষেত্রে সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় গতকাল শনিবার রাতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় অর্থনীতিবিদেরা এই পরামর্শ দেন। অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে সঙ্গে নিয়ে এই বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বৈঠকে অংশ নেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য মনজুর হোসেন, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্সের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ প্রমুখ।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে অর্থমন্ত্রী সবার কথা শুনেছেন। নিজে কথা বলেছেন কম। অর্থমন্ত্রী সরকারি প্রকল্পের অতি মূল্যায়ন এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি—এই দুই বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকল্প তৈরিই করা হয় বাড়তি ব্যয় ধরে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে তাই আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কৌশল নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠলে আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়বে—যা বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। আরও আছে প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ধাক্কা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান কমে গেলে প্রবাসী আয় কমে যেতে পারে। ফলে বাজেট নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। বরং রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে ব্যয় কাঠামো ঠিক করতে হবে।
বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোন কোন ক্ষেত্রে কাজ এগোচ্ছে, সেটিও তুলে ধরা হয়। এরপর শুরু হয় খোলামেলা আলোচনা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্র জানায়, আসন্ন বাজেট, কাঠামোগত সংস্কার এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব—এই তিন বড় বিষয় উঠে আসে আলোচনায়। বৈঠকে অংশ নেওয়া অনেকেই মনে করেন, প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতানির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে বাজেট করতে হবে এবার।
নীতি সুদ নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নীতি সুদ কমানোর কোনো সুযোগ নেই এখন। কারণ, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে। জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এ সময় সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়া হবে।
জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত এমআরএর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এখনই নীতি সুদহার না কমানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি। অনেকেই তাতে একমত হয়েছেন। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, সুদের হার কমানো হলে আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে।
বৈঠকে করব্যবস্থার সংস্কার ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি নিয়েও আলোচনা হয়। অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, করের আওতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায় বাড়ানো যাবে না। এ জন্য এনবিআরের আধুনিকায়ন, স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংস্কারবিরোধী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধও বড় বাধা হতে পারে, যা রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া মোকাবিলা করা কঠিন হবে বলেও মত দেন তাঁরা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ সরকারের খরচের চাপ বাড়ছেই। ফলে এনবিআরের মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
যোগাযোগ করলে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থনীতিবিদেরা পরামর্শ দিয়েছেন রাজস্ব আয় বৃদ্ধির। আয় বাড়াতে আমাদের চেষ্টা ও কৌশলের কমতি নেই। এবার চেষ্টা করছি সম্পদ কর আরোপের।’
অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। তাই নির্বাচনী অঙ্গীকার, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য—সবকিছুরই প্রতিফলন আগামী বাজেটে থাকতে হবে বলে মত দেন অর্থনীতিবিদেরা। পরিবার কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা ইত্যাদি বাস্তবায়নের উদ্যোগগুলো কীভাবে বাজেটে প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।
অর্থনীতিবিদেরা বলেন, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে, টেকসই অর্থায়নের ভিত্তিতে। অন্যথায় বাজেট–ঘাটতি ও ঋণের চাপ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দেন অর্থনীতিবিদেরা। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত বার্তা দেওয়া জরুরি বলে মত দেন তাঁরা।