গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সরকারের ৬ মাস

রিজার্ভে স্বস্তি, বিনিয়োগ মন্দায়

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল ব্যাংক খাত, বড় রাজস্ব ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপ—অর্থনীতির এ সবই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল বিএনপি সরকার। ছয় মাসে এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয়নি।

তবে ডলার, রিজার্ভ, প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে কিছুটা স্বস্তি আছে। মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ে সামান্য কমেছে। যদিও কয়েক বছর ধরে দাম বাড়তে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফেরেনি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট লক্ষণ নেই। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করেছে।

ছয় মাসে সরকার ব্যবসার বাধা কমানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ঋণের খরচ কমানোর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ব্যাংক, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতের সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে খানিকটা স্থিতিশীলতা এসেছে, কিন্তু পুনরুদ্ধার শুরু হয়নি।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে দুই বছর সময় লাগবে। অর্থনীতি স্থিতিশীল ও পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার কী কী করছে, তার একটি তালিকাও গতকাল সরকার প্রকাশ করেছে। যেমন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ, পুঁজিবাজার সংস্কারের পদক্ষেপ, ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি, ইত্যাদি।

অর্থনীতির সংকট যেভাবে হয়েছে

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি নানামুখী সংকটে পড়েছিল। ডলারের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগও জোরালো হয়। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণনির্ভর বড় প্রকল্প এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে অর্থনীতির পতনের গতি থামানোর চেষ্টা করে। বিনিময় হার ও ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার শুরু হয়। ডলারের সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসে। তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বলই থেকে যায়।

বর্তমান সরকার তাই তুলনামূলক স্থিতিশীল একটি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পেলেও সামগ্রিকভাবে দুর্বল অর্থনীতিই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। সরকারের সামনে এখন মূল্যস্ফীতি আরও কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দায়িত্ব। ব্যবসার অপ্রয়োজনীয় বাধা কমাতে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন এবং বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও নীতি সুদের হার কমিয়েছে। তবে দুর্বল ব্যাংক খাত, বড় রাজস্ব ঘাটতি এবং সাম্প্রতিক তীব্র জ্বালানিসংকট অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না হলে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধির উপলক্ষ তৈরি হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ পান না। বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা থাকে। সার্বিকভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না।

অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের চেষ্টার কমতি নেই। তবে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। এটির সমাধান সময়সাপেক্ষ।
মুস্তফা কে মুজেরী, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক

বাজারে স্বস্তি নেই

প্রায় চার বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে আছে দেশের মানুষ। বিএনপি সরকারের সামনেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যে চার মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। গত জুলাই মাসে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়। যদিও বাজারে গিয়ে মূল্যস্ফীতি কমার প্রভাব টের পাওয়া যায় না।

আবার সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি হার কম থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরকার সীমিত আয় ও গরিব মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সবচেয়ে কষ্টে আছে মধ্যবিত্তরাই, তাদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছেই

বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে কম।

কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ার অন্যতম কারণ সংস্কার না হওয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এনবিআর বিলুপ্ত করে শুল্ক-কর নীতি এবং রাজস্ব আদায়ব্যবস্থা আলাদা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা–ও থমকে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অধ্যাদেশটি সংসদে ওঠানো হয়নি।

তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে ঋণ চাওয়ার পর তা নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। এই বিল পর্যালোচনার জন্য গত এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ওই কমিটি তাদের সুপারিশ দেয়নি।

বিনিয়োগে মন্দা, কর্মসংস্থানে গতি নেই

এক দশকের বেশি সময় ধরে বিনিয়োগ মন্দা অবস্থায়। নতুন সরকার এলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে খুব বেশি উৎসাহ নেই উদ্যোক্তাদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য–উপাত্ত বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্যে সাড়ে ৬ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামালে কমেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত ১৪ বছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে এখন সবচেয়ে কম হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগের হার। জিডিপির অনুপাতে তা ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বেসরকারি খাতের ঋণ নেওয়ার হারও গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে সরকার দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছে। স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে একাধিকবার দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানায় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের ১৪ প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী। ব্যবসা-বাণিজ্যের অপ্রয়োজনীয় ধাপ ও খরচ কমাতে সরকার ১০ আগস্ট একটি জাতীয় টাস্কফোর্সও গঠন করেছে।

নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষিত তরুণেরা বেশি বেকার থাকছেন। গত এক দশকে উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী নিয়ে বেকার আছেন, এমন তরুণের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এই সংখ্যা এখন প্রায় ৯ লাখ। গত ছয় মাসে চাকরি পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে এখন জ্বালানিসংকট প্রধান আলোচনার বিষয়। অতি দ্রুত এর সমাধান করতে হবে। ব্যাংক খাত এলোমেলো অবস্থায় আছে। গত ছয় মাসে সরকার বেশ কিছু ভালো উদ্যোগও নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন। এখন এর বাস্তবায়ন করতে হবে।

ডলার নিয়ে স্বস্তি, রিজার্ভও বেড়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই ডলারের সংকট কাটতে শুরু করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়। বর্তমান সরকার গত ছয় মাসে সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছে। এ সময়ে ডলারের বড় ধরনের সংকট দেখা যায়নি। ডলারের দামও ১২৩ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে ছিল।

দেশে ডলার আসার প্রধান দুটি উৎস হলো প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়। গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল। তবে জুন ও জুলাইয়ে তা আবার ৩০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে যাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও রপ্তানি আয়ে গতি রয়েছে।

প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবাহে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১২ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২২৬ কোটি ডলার।

ব্যাংক সংস্কারে মিশ্র চিত্র

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সচল করতে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। সংকটে পড়া ব্যাংক পুনর্গঠন বা বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন প্রণয়নের কাজও তখন শুরু হয়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনটি পাস করে। তবে এতে দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হলে সরকার শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত ধারাটি বাতিল করে। তবে নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি আর্থিক খাত সংস্কারে কমিশন গঠনের কথা বললেও এর বাস্তব উদ্যোগ নেই। তবে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আপাতত কমেছে।

পাচার হওয়া টাকা ফেরাতে চুক্তি

বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিনের মধ্যে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের চুক্তি বাতিল করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। বাংলাদেশে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর দেওয়ার ঘটনা প্রথম।

লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। সেই খেলাপি ঋণ এখন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারলে বিপদে থাকবে দেশের ব্যাংক খাত।

আবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০টি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধের অনিয়ম, দুর্নীতি, কর ফাঁকি, অর্থ পাচারের তদন্ত অব্যাহত রেখেছে বর্তমান সরকার। পাশাপাশি ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে, এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে কি না, তা–ও তদন্ত করা হচ্ছে। বিদেশে পাচার করা সম্পদ খুঁজে বের করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় আটটি বড় বিদেশি সংস্থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ওই আট সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বেড়েছে

বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপও বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশ ৪৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। এটি এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। গত ১৪ বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ চার গুণের বেশি বেড়েছে।

আগামী বছরগুলোতে এই চাপ আরও বাড়বে। কারণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা। তৃতীয় টার্মিনালের ঋণ পরিশোধ করতে হবে জাপানকে। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনা, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নতুন বিদেশি ঋণ নেওয়া এবং ঋণের অর্থে নির্মিত প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

সুদ কমানো কতটা কাজে দেবে

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো নীতি সুদ কমানো। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২১ মাস পর গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে। সরকারের আশা, ঋণের সুদ কমলে উদ্যোক্তাদের ব্যবসার খরচ কমবে এবং তাঁরা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।

তবে নীতি সুদ কমলেই ব্যাংকঋণের সুদ দ্রুত কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। শুধু সস্তায় ঋণ পেলেই বিনিয়োগ বাড়ে না। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, সহজ নিয়মকানুন এবং ধারাবাহিক করনীতিও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ফলে নীতি সুদ কমানোর সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা ব্যাংক খাতের সক্ষমতা ও সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশের উন্নতির ওপর নির্ভর করবে।

সমাধান কতটা সময়সাপেক্ষ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের চেষ্টার কমতি নেই। তবে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। এটির সমাধান সময়সাপেক্ষ। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তলানিতে আছে। শিক্ষিত তরুণ ও নারীদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে।

মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, অর্থনীতির সমস্যাগুলো মৌলিক। যেমন: গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট চলছে। আমদানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি খাতে এখন টালমাটাল অবস্থা। তাই জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে না পারলে অন্য প্রচেষ্টা সফল হবে না। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ কষ্টে আছে। জীবনযাত্রার মান নিচের দিকে নামছে। এদিকেও নজর দিতে হবে।

ব্যাংক খাত নিয়ে মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নীতি সুদহার কমানোর ফলে ঋণের সুদের হার কমবে, এমন বলা যায় না। ব্যাংক নিয়ে আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যতক্ষণ ব্যাংক খাত সবল না হবে, ততক্ষণ নীতি সুদহার কমিয়ে ঋণের খরচ কমানো কঠিন হবে। অন্যদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে ঋণের চাহিদাও কম থাকবে।