বাজেট ২০২৬–২৭

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষের সুরক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নাকাল মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। সংসার চালানোর খরচ বাড়ছে। চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, শাকসবজি, মাংস—সব নিত্যপণ্যই আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বাড়তি খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। তাঁদের অনেকে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন।

গত দুই মাসের মধ্যে অকটেন, পেট্রলসহ জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় বেড়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস–বিদ্যুতের দামও বেড়েছে। এসব কারণে আবারও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আতঙ্ক ভর করেছে সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে। সর্বশেষ গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, তিন বছরে বেতন বেড়েছে ৫ হাজার টাকা; কিন্তু খরচ বেড়েছে ১০–১২ হাজার টাকা। তাই প্রতি মাসেই সঞ্চয় ভেঙে এবং ধারদেনা করে খেতে হচ্ছে। আবদুল্লাহ আল মামুনের মতো বহু মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন নিরুপায় দশা বিরাজ করছে।

আবদুল্লাহ আল মামুন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও হিসাব বিভাগে কাজ করেন। তাঁর বেতন এখন ৪৫ হাজার টাকা। স্ত্রী–সন্তানসহ চারজনের সংসার। সর্বশেষ জানুয়ারি মাসে তাঁর বেতন পাঁচ হাজার টাকা বেড়েছে। এর আগের তিন বছরে বেতন বাড়েনি। আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত তিন–চার বছরে তাঁর সংসার খরচ বেড়েছে ১০–১২ হাজার টাকা। দুই বছর আগেও বাসাভাড়া, সংসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে হাতে এক–দুই হাজার টাকা থাকত। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর কোনো সঞ্চয় হচ্ছে না।

আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, তিন বছরে বেতন বেড়েছে ৫ হাজার টাকা; কিন্তু খরচ বেড়েছে ১০–১২ হাজার টাকা। তাই প্রতি মাসেই সঞ্চয় ভেঙে এবং ধারদেনা করে খেতে হচ্ছে। আবদুল্লাহ আল মামুনের মতো বহু মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন নিরুপায় দশা বিরাজ করছে।

টানা চার বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। এখন মূল্যস্ফীতির চাপ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বেশি পড়ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার খরচে আরেক দফা চাপ আসতে পারে। তাই বাজেটের সামাজিক সুরক্ষার প্রধান লক্ষ্য যেন হয় মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ

ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে চার বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতির সমস্যাকে খুব একটা স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নানা উদ্যোগে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খায়। আগামী বাজেটে সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে সাড়ে ৭ শতাংশ। তবে সরকার বন্ধ কারখানা চালুসহ বিভিন্ন খাতে যেভাবে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াচ্ছে, তাতে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনা কতটা সম্ভব হবে, এ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, টানা চার বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। এখন মূল্যস্ফীতির চাপ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বেশি পড়ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার খরচে আরেক দফা চাপ আসতে পারে। তাই বাজেটের সামাজিক সুরক্ষার প্রধান লক্ষ্য যেন হয় মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো।

গত এক বছরে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ–মাংস, শাকসবজিসহ প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ। এখন কেজিপ্রতি ৫০ টাকার কমে মোটা চাল পাওয়া যায় না। মোটা চালের দাম এখন কেজিপ্রতি ৫২–৫৬ টাকা। মাঝারি মানের ব্রি–২৮ চালের দাম এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৬ শতাংশ।

মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে টাকার অবমূল্যায়ন হবে, যা আমদানি খরচ বাড়াবে। বাজেটের আকার আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো বাড়ছে। এর মানে, টাকার প্রবাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করবে। আবার বিশাল রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য অর্জন বেশ কঠিন হবে। তাই বাজেটঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ বেশি নিতে হবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ আটকে দেবে। ফলে আবার অর্থনীতির গতি বাধাগ্রস্ত হবে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে সর্বশেষ মে মাসে। গত মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর এটিই সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাস (জুলাই-জানুয়ারি) সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে ছিল। সর্বশেষ পাঁচ মাসের মধ্যে তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের মধ্যে ৮ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতির উচ্চ ভিত্তির ওপর এখনকার মূল্যস্ফীতি গণনা করা হয়। ফলে দুই বছরে আগের চেয়ে এখন মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর চাপ অনেক বেশি।

যেসব পণ্যের দাম বেড়েছে

গত এক বছরে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ–মাংস, শাকসবজিসহ প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ। এখন কেজিপ্রতি ৫০ টাকার কমে মোটা চাল পাওয়া যায় না। মোটা চালের দাম এখন কেজিপ্রতি ৫২–৫৬ টাকা। মাঝারি মানের ব্রি–২৮ চালের দাম এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৬ শতাংশ। বর্তমানে ব্রি–২৮ মানভেদে কেজিপ্রতি ৫৪–৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর সরু চাল বা নাজিরশাইল ও মিনিকেটের দাম বেড়েছে ২ শতাংশ। দাম কেজিপ্রতি ৭০–৮৫ টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এখন মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ২০ শতাংশের মতো, একক পণ্য হিসেবে যা সর্বোচ্চ। তাই চালের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতিতে বেশি প্রভাব পড়ে।

সাধারণ মানুষকে বছরজুড়েই বাড়তি দামে শাকসবজি কিনে খেতে হয়েছে। শীতের সময় ভরা মৌসুমেও কেজিপ্রতি ৪০ টাকার নিচে কোনো সবজি মেলেনি। এখন ৭০–৮০ টাকার নিচে বেগুন, করলা, কাঁকরোল, ঢ্যাঁড়স, পটোল, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙে, বরবটিসহ সবজি মিলছে না।

গত এক বছরে সাধারণ মানুষকে ভোজ্যতেলও বেশ ভুগিয়েছে। ছয়–সাত মাস বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকট ছিল। প্রতি লিটারের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা হলেও সংকটের কারণে ২০০ টাকার বেশি দামে তেল কিনতে হয়েছে। তবে মাস দেড়েক আগে সরকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায়। এখন বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। একই সময়ে লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিনের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৮৫–১৯০ টাকা। খোলা পাম তেলের দাম ১২ শতাংশ বেড়ে ১৬৫–১৭০ টাকা হয়েছে।

এ ছাড়া সাধারণ মানুষকে বছরজুড়েই বাড়তি দামে শাকসবজি কিনে খেতে হয়েছে। শীতের সময় ভরা মৌসুমেও কেজিপ্রতি ৪০ টাকার নিচে কোনো সবজি মেলেনি। এখন ৭০–৮০ টাকার নিচে বেগুন, করলা, কাঁকরোল, ঢ্যাঁড়স, পটোল, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙে, বরবটিসহ সবজি মিলছে না।

প্রকৃত মজুরি কমেছে

মূল্যস্ফীতি একধরনের কর। ধরা যাক, সংসার চালাতে কারও বেতনের পুরোটা খরচ হয়ে যায়; কিন্তু হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সে অনুযায়ী আয় না বাড়লে হয় ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে, নয়তো খরচে কাটছাঁট করতে হবে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) জাতীয় গড় মজুরিহার কখনোই মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। সেই হিসাবে দেশের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মজুরিহার ছিল গত মে মাসে। ওই মাসে জাতীয় মজুরিহার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। গত ১১ মাসে মজুরিহার ৮ শতাংশের আশপাশেই ছিল। কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। তবে সাধারণ মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়েনি। গ্রাম-শহরনির্বিশেষে ১৪৫টি নিম্ন দক্ষতার পেশার মজুরি নিয়ে এই হিসাব করে বিবিএস। বিবিএস বলছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এমন কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির মতো। এই শ্রেণির মানুষের অনিশ্চয়তা বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ বাজার কঠোর তদারকির মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব। প্রয়োজনে চালের দাম সহনীয় রাখতে বাজার কৌশল নির্ধারণ করাও জরুরি। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গরিব মানুষকে বাজেটের মাধ্যমে নগদ ও খাদ্যসহায়তা দিয়ে সুরক্ষা দিতে হবে।