বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংক

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন

দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা, কাজ হারাতে পারেন ৬ লাখ মানুষ

ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। কোভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে এমনিতে দারিদ্র্য লোকের সংখ্যা বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, ২০২৬ সালে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এ বছর মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য অবস্থা কাটাতে পারবে। বাকি ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য অবস্থা থেকে বের হওয়ার কথা থাকলেও তারা পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে পারবে না। শুধু তা–ই নয়, এ বছর ছয় লাখ মানুষ কাজ হারাতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি তেল, সার কেনাসহ আমদানি খরচ মেটাতে বাংলাদেশ সরকার বাজেট সহায়তা চাইলে গত ১৫ জুন বিশ্বব্যাংক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। সেখানে এ কথাগুলো বলা হয়।

দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেখা দেওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের কাছে বাজেট সহায়তা চেয়েছিল বর্তমান সরকার। বিশ্বব্যাংক তাতে রাজি হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক শর্ত দেয়, এত দিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে অব্যবহৃত অর্থ পড়ে আছে, তা একসঙ্গে করে বাজেট সহায়তা দেওয়া হবে। এসব অর্থ বাংলাদেশের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া আছে। ২৬ জুন ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করে বিশ্বব্যাংক।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, দারিদ্র্য অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার লোকের সংখ্যা কমছে। এটি বেশ উদ্বেগজনক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তখন প্রত্যাশা ছিল, নতুন রাজনৈতিক সরকারের সময়ে বিনিয়োগ বাড়বে ও নতুন কর্মসংস্থান হবে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর বাংলাদেশের ব্যাপক নির্ভরতা বড় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে, যা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বারবার দেখা গেছে।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এই তথ্য নতুন সরকারের জন্য বিব্রতকর। এর মানে, অর্থনীতি আটকে থাকার পরিস্থিতি অব্যাহত আছে, এমন ইঙ্গিত দেয়। সরকার ঘোষিত জনপ্রিয় উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি অর্থনীতির দুর্বল কাঠামোগত বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। যেহেতু দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার লোকের সংখ্যা কমেছে, তাই সরকার ঘোষিত বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো যেন দরিদ্রদের উপযোগী হয়। রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বেরিয়ে এসে নির্মোহভাবে সুবিধাভোগী চিহ্নিত করতে হবে।

বাজেট সহায়তার অর্থ কীভাবে খরচ হবে

বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তার অর্থ দিয়ে মূলত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা জ্বালানি পণ্যের দাম পরিশোধ করা হবে। এ ছাড়া সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নগদ সহায়তা ও জীবিকা সহায়তা দেওয়া হবে। এর ফলে সংকটের সময়ে আয় স্থিতিশীল রাখা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করবে প্রকল্পটি।

ইতিমধ্যে বাজেট সহায়তার অর্থ বাংলাদেশের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার কেনাসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে তা খরচ করা শুরু হয়েছে বলে সূত্রগুলো বলছে।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে কী আছে

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য কমানোর গতি কমে যায়। ২০২৫ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এ বছর মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, এ বছর যে অর্জন প্রত্যাশা করা হয়েছিল, এর বড় অংশ অর্জন করা যাবে না। উল্টো প্রায় ছয় লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৬ সালে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ১০ শতাংশের জন্য জিনিসপত্রের বাড়তি দামকে দায়ী করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি জটিল হয়েছে

বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ এক বহুমাত্রিক সংকট ও ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা এবং তীব্র ভূরাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো বড় ধরনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সীমিত করে দিয়েছে। ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কর–জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। টানা তিন বছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। জ্বালানি ভর্তুকি ও ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণের ব্যয় বাড়ার কারণে রাজস্ব ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে ২৬ বার বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের মুখে পড়ে, যার ফলে বার্ষিক বিক্রির ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ কমে যায়।

জ্বালানি খাত নিয়ে যা আছে

আমদানিনির্ভর জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর বাংলাদেশের ব্যাপক নির্ভরতা বড় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে, যা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বারবার দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে এমন কথা বলা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ৫০ শতাংশের বেশি আসে গ্যাস থেকে। বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের ৬০–৬৫ শতাংশ ও এলএনজির ৫৫–৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ইতিমধ্যে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এলএনজির স্পট মূল্য বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউয়ে ২৪–২৮ মার্কিন ডলারে উঠেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণের বেশি।

বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, ২০২৬ সালে জ্বালানি খাতে মোট ভর্তুকির বোঝা দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর পরিমাণ দেড় থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার হয়েছিল। ভর্তুকি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক ও জরুরি খাতে খরচ করার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

ইউরিয়া, ডায়ামোনিয়াম ফসফেট, ট্রিপল সুপার ফসফেট ও মিউরিয়েট অব পটাশের মতো সারের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। অন্যদিকে দেশে ইউরিয়া উৎপাদনও স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ইতিমধ্যে এই ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ইউরিয়ার দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম দ্বিগুণও হতে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

বেসরকারি খাত ও কর্মসংস্থান

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত ও শ্রমবাজার ব্যাপক কাঠামোগত দুর্বলতার মুখে রয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে ২৬ বার বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের মুখে পড়ে, যার ফলে বার্ষিক বিক্রির ৯ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধানের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ কমে যায়।

বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, শ্রমবাজারের অবস্থাও কাঠামোগতভাবে অবনতি হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া নতুন কর্মসংস্থানের প্রতি ১০টির মধ্যে সাতটি হয়েছে কম উৎপাদনশীল কৃষিতে।