
দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। এই সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এমনকি স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব কাজে তাঁদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অনানুষ্ঠানিক খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের চাকরির নিয়োগপত্র থাকে না। ফলে আইনি সুরক্ষা নেই বললেই চলে। নিয়োগকর্তা চাইলে যেকোনো সময় কাজ থেকে বাদ দিতে পারেন। এই খাতে নির্ধারিত মজুরিকাঠামো নেই।
এদিকে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় আর বেশি নেই। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো দুর্বল। ফলে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরিন আহমেদ মাহবুব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত বা সুরক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোট উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের অনানুষ্ঠানিক খাত জরিপ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কম। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের হার ওই দেশগুলোর গড়ের অর্ধেক।
শ্রম-উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম-উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। এ দুই দেশের পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে পিছিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটন ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি অত্যন্ত ধীর। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মিসংখ্যা কমাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর তা কমতে শুরু করবে। বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। তখন বাংলাদেশ ‘বয়স্ক সমাজে’ পরিণত হবে।
অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশ আরও কয়েক বছর জনমিতিক সুবিধা পাবে। তবে এ সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি, শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে এই সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হাতে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় কিছুটা বেশি আছে। ভারতের হাতে এ সুযোগ কাজে লাগানোর সময় আছে আট বছর, ভুটানের পাঁচ বছর। তবে এ সময় কাজে লাগাতে দ্রুত কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, আগামী দুই দশকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন করা না গেলে বাংলাদেশ ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল মানুষের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো দুর্বল।
স্বাস্থ্যসেবায় শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। দেশে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। বিপরীতে শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বনিম্ন। এ অঞ্চলে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির গড় হার ৬২ শতাংশ। এ ছাড়া শিক্ষায় বাংলাদেশের সরকারি বরাদ্দও অত্যন্ত কম।
অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতিও দুর্বল। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেবার সব উপাদান রয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ কেন্দ্রে। অর্থাৎ ৮২ শতাংশ কেন্দ্রের প্রস্তুতি নেই। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে ইনজেকশনযোগ্য ইনসুলিন ও ৩৮ শতাংশে মেটফরমিন পাওয়া যায়। হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান একসঙ্গে রয়েছে ১ শতাংশের কম প্রতিষ্ঠানে।
জনসংখ্যা বয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। কিন্তু এ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে এ হার আরও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ পায় এই শিশুরা।
প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষার অবস্থাও দুর্বল। বাংলাদেশে সরকারি বয়স্ক ভাতা মাসে মাত্র ৫০০ টাকা বা প্রায় ৬ ডলার। দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের তুলনায় এই ভাতার পরিমাণ মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে এই ভাতা দারিদ্র্যসীমার তুলনায় অনেক কম।
কর-রাজস্ব আদায়েও বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতির অর্ধেকের বেশি দেশের চেয়ে পিছিয়ে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকারের উল্লেখযোগ্য পেনশন কর্মসূচি নেই। অথচ দেশের অধিকাংশ কর্মীই এই খাতে নিয়োজিত।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের চেয়ে শ্রমের জোগান ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব না-ও হতে পারে। এ কারণে আগামী দুই দশককে জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
এ লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবা জোরদার করা ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন সহজ করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ বিষয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচনা করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন। এর আগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ।