
দেশে অনেক দিন ধরেই বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। করপোরেট করহার তিন বছরে ধাপে ধাপে কমিয়ে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হলেও মোট করভার এখনো ৪০ শতাংশের বেশি। নতুন করে টার্নওভার বা লেনদেন কর বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এটি হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মূলধনে টান পড়বে। তখন বিনিয়োগ আরও কমে যেতে পারে।
‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেন, কর না কমালে বিনিয়োগ হবে না। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ৫ শতাংশে নামিয়ে আনলে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেবেন। ভারতে জিএসটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পর রাজস্ব আদায় বেড়ে গেছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতা, ব্যবসায়ী, সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ, সাবেক আমলা ও দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য দেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
স্বাগত বক্তব্যে এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, উচ্চ সুদহার ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—এসব কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে গেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশা—আসন্ন জাতীয় বাজেটটি যেন “শাস্তিমূলক” না হয়ে “সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী” হয়।’
কামরান টি রহমান বলেন, দেশে এক কোটি টিআইএনধারী থাকলেও তার মাত্র অর্ধেক আয়কর রিটার্ন দিচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে টিআইএন ও এনআইডি ডেটাবেজ একীভূত করা হোক। এ ছাড়া নতুনদের করভীতি দূর করতে ১০০ বা ১০০০ টাকার প্রতীকী ন্যূনতম কর দেওয়ার প্রথা চালু করা যেতে পারে। করপোরেট কর কমানো হলেও নগদ লেনদেনের কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সুবিধা নিতে পারছে না। ফলে শর্তটি বাতিল করা দরকার। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আরও আড়াই শতাংশ কমানোর দাবি করেন তিনি।
ব্যবসা না হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে না। এ বাস্তবতা সরকারকে বুঝতে হবে। কর আদায়ের সঙ্গে তা যথাযথভাবে ব্যয় হবে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে করদাতাদের মধ্যে আস্থা আসবে না।মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর
মূল প্রবন্ধে আইসিএবির সাবেক সভাপতি এম শাহদাৎ হোসেন ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের দাবি করেন। এ ছাড়া টার্নওভার কর কমিয়ে দশমিক ৩ শতাংশ করার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহে টিডিএস বা উৎসে কর কমানোর অনুরোধ করেন।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, দেশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। আর্থিক খাতের নৈরাজ্য বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে আর্থিক খাতের সংস্কার চলমান রাখতে হবে।
বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাজেট প্রণয়নের অনুরোধ করে শাশা ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, ‘আট মাস ধরে পণ্য রপ্তানি কমছে। এটির প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতে পড়ছে। সামনে রপ্তানি আরও কমার আশঙ্কা আছে। আমরা শুনছি, টার্নওভার কর আড়াই শতাংশ করার চিন্তাভাবনা হচ্ছে। সেটি হলে সব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা হয়ে যাবে ৩০ শতাংশ। আর দেড় শতাংশ টার্নওভার কর হলে মুনাফা হবে ২০ শতাংশ। এটি বাস্তবসম্মত নয়।’
‘করের বোঝা কমান’
ভ্যাটের হার কমালে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে মন্তব্য করেন মেট্রো চেম্বারের সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম। তিনি বলেন, ‘আমরা ভ্যাট দিচ্ছি ১৫ শতাংশ। এটিকে অর্ধেক করা হলে ভ্যাট আদায় বাড়বে। করজালও বাড়ানোর সুযোগ আছে।’ কর কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান গোলাম মঈনুদ্দিন বলেন, পণ্য রপ্তানিতে ১ শতাংশ উৎসে কর কমানো দরকার। না হলে রপ্তানিকারকেরা সমস্যায় পড়ে যাবেন।
স্কয়ার টয়লেট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মালিক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, দেশের যত নারীর স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার কথা, তার মধ্যে করছেন মাত্র ২৩ শতাংশ। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করার কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। করের কারণে পণ্যটির দাম কমানো যাচ্ছে না। উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি থাকলেও কাঁচামাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক ও কর আছে। এটিকে কমানো গেলে পণ্যটির দাম কমবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে বর্তমানে করপোরেট কর সাড়ে ২৭ শতাংশ। মোট করভার ৪০ শতাংশের বেশি। তাহলে কেন বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশে বিনিয়োগ করবেন। করপোরেট কর না কমালে পুনর্বিনিয়োগও হবে না।স্নেহাশীষ বড়ুয়া, প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার, স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানি
টার্নওভার কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা দরকার বলে মন্তব্য করেন বিএসআরএমের কর্মকর্তা সৌমিত্র কুমার মৌৎসুদ্দী। তিনি বলেন, জনগণ কেন কর দিতে চান না, সেদিকে নজর দিতে হবে। সরকারকে মানসম্মত খরচ করতে হবে, তাহলে মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হবেন।
ট্রান্সকম বেভারেজের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মাঈনুল হুদা বলেন, ২০২৩ সালে বেভারেজ শিল্পে ন্যূনতম কর দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। পরের বছর সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। গত বছর কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। উচ্চ করহারের কারণে গত তিন বছরে বেভারেজ খাতে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ কমেছে। এতে সরকারের রাজস্ব আদায় কমেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ কেন আসবে
স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘১০ বছর চেষ্টার পর কর করপোরেট কর ৩৫ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে আনা গেছে। ২০২৫ সালেই আবার আড়াই শতাংশ বাড়ানো হয়। অথচ ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশে ২০-২২ শতাংশ করপোরেট কর। আমাদের দেশে সেই কর সাড়ে ২৭ শতাংশ। মোট করভার ৪০ শতাংশের বেশি। তাহলে কেন বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশে বিনিয়োগ করবেন। করপোরেট কর না কমালে পুনর্বিনিয়োগও হবে না।’
স্নেহাশীষ বড়ুয়া আরও বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে করজাল বাড়বে না। যাঁরা কর দিচ্ছেন, তাঁরাই শুধু কর দেবেন। সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট করা হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় অনেক বেশি হবে। ৫ শতাংশ ভ্যাট যথাযথ হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ব্যবসা না হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে না। এই বাস্তবতা সরকারকে বুঝতে হবে। কর আদায়ের সঙ্গে তা যথাযথভাবে ব্যয় হবে, সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। না হলে করদাতাদের মধ্যে আস্থা আসবে না।