চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। হরতাল–অবরোধের মতো কর্মসূচি ফিরে এসেছে, ঘটেছে সংঘাত। আগামী নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এখন দেশ। বর্তমান পরিস্থিতি, অর্থনীতিতে এর প্রভাব–প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক জেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ।

এ মুহূর্তে আমরা একটা ভঙ্গুর অবস্থায় আছি। দেড় বছর ধরে সামষ্টিক অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে, একটা অস্থির সময় পার করছে। আমরা সেখান থেকে উত্তরণের আগেই নির্বাচনকেন্দ্রিক এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছি। আমি বলব, এটা আমাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো হয়েছে।
যেকোনো ধরনের অনিশ্চয়তা সার্বিক ব্যবসা–বাণিজ্য–বিনিয়োগের জন্য খারাপ। সেটা নীতিগত অনিশ্চয়তা হোক কিংবা অর্থায়ন–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা। তবে এর মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বেশি খারাপ। আমরা এখন অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছি। এটা দ্বিমুখী আঘাত।
আমরা স্বল্প উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পর্যায়ে রয়েছি। এলডিসি হিসেবে আমরা ব্যবসা–বাণিজ্যে যেসব সুবিধা পেতাম তা উঠে যাবে। আমাদের রপ্তানির ৭০ শতাংশই হয় এলডিসি হিসেবে আমরা যে শুল্ক সুবিধা পাই, তার আওতায়। শুল্ক সুবিধা উঠে গেলে আমরা শক্ত প্রতিযোগিতায় পড়ব। আমরা প্রণোদনা দিতে পারব না। এখন আমরা নতুন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতির পর্যায়ে আছি। এ ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ আছে, বর্তমান পরিস্থিতি তাতে আঘাত হিসেবে আসবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও বেশি অংশভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায়ও আমরা রয়েছি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও বেশি অংশগ্রহণ, আরও বেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু অর্থনীতির অবস্থা যদি খারাপ হয়, আমাদের রিজার্ভ যদি কমে, অনিশ্চয়তা যদি বাড়ে, তাহলে আমাদের ব্যাপারে বাইরের বিশ্বের আস্থার ঘাটতি তৈরি হবে। একটি উদাহরণ দিতে পারি। একটি বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু তারা এখন জানিয়েছে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা ধীরে এগোতে চায়।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে বাংলাদেশের নির্বাচনের মান নিয়ে আগ্রহ ও চাপ দুটোই আছে। আবার যে মহল থেকে বাংলাদেশের নির্বাচনের মান নিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তারা আমাদের রপ্তানির মূল গন্তব্য ও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের বড় উৎস। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে ভূ–অর্থনৈতিক কৌশল ঠিক করতে হয়। এসব দেশের সক্রিয় সমর্থন থাকলে আমাদের জন্য পরিস্থিতি সহজ হয়। কিন্তু তারা যদি নীরবে তাদের কোম্পানি ও রপ্তানিকারকদের বার্তা দেয়, তাহলে তারা হয়তো বাণিজ্যবিষয়ক সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে। বিভিন্ন রেটিং এজেন্সি, যারা ঋণমান ঠিক করে, তারাও এসব পরামর্শ আমলে নিতে পারে। নিশ্চিতভাবে এটা ঝুঁকি তৈরি করবে।
অর্থনীতির চাপ কমাতে এখন প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির চেয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া দরকার। একটি আদর্শ পরিস্থিতিতে বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিময় ব্যবস্থায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে, যাকে বলে ম্যানেজড ফ্লোট। পুঁজির পাচার কমাতে না পারলে হুন্ডি বন্ধ হবে না।
বর্তমানে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে রাজনীতিবিদদের একটা রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। সংঘাত এড়াতে তাদের রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে এবং এটা করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। দেরি হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া অর্থনীতির ঝুঁকি দূর করা যাবে না।
একই সঙ্গে অর্থনীতিকে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তৈরি করতে হবে। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো, আরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আনা, রপ্তানি বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো গড়ে তোলা—সব কিছুর বিষয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। চালিয়ে যেতে হবে সংস্কার কর্মসূচি।