বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় টানা দ্বিতীয় বছর ৬৮তম অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক তালিকায় অবস্থানের উন্নতি হয়নি। একই সময় শীর্ষ ১০০ বন্দরের সম্মিলিত কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
লন্ডনভিত্তিক শিপিংবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্ট ২০২৫ সালের কনটেইনার পরিবহনের তথ্যের ভিত্তিতে ‘ওয়ান হানড্রেড পোর্টস ২০২৬’ শীর্ষক তালিকাটি প্রকাশ করেছে।
বন্দরের হিসাবে, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন হয়েছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার (প্রতিটি কনটেইনার ২০ ফুট লম্বা)। ২০২৪ সালে পরিবহন হয়েছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার একক কনটেইনার। সেই হিসাবে কনটেইনার পরিবহন ৪ শতাংশ বেড়েছে। বাস্তবতা হলো, এই সময় বিশ্বের সেরা ১০০ বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধির হার কম।
লয়েডস লিস্টের প্রকাশনায় চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকলেও এপিএম টার্মিনালস, এমএসসি ও রেড সি গেটওয়ের বড় বিনিয়োগ বাংলাদেশের প্রধান কনটেইনার বন্দরের ভবিষ্যৎ চিত্র বদলে দিচ্ছে।
কোন বন্দর কত কনটেইনার পরিবহন করেছে, সেই তুলনা করে লয়েডস লিস্টের এই ক্রমতালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা দিয়ে বন্দরে সেবার মান বিচার করা হয় না। তবে কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা দিয়ে অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারণা পাওয়া যায়। কেননা, কনটেইনারে শিল্পের কাঁচামাল ও মূল্যবান পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়।
বিশ্বের কনটেইনার পরিবহনে চীনের আধিপত্য এবারও অব্যাহত রয়েছে। তালিকার শীর্ষে আছে সাংহাই বন্দর। ২০২৫ সালে সাংহাই বন্দর দিয়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় যা প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সিঙ্গাপুর। এই বন্দর দিয়ে ২০২৫ সালে ৪ কোটি ৪৬ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় কনটেইনার পরিবহনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে আছে চীনের নিংবো-ঝুশান বন্দর। এই বন্দর দিয়ে ৪ কোটি ৩৮ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন হয়। এই বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দরের ৬টিই চীনের।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে শীর্ষ ১০০ বন্দর দিয়ে ৭৯ কোটি ২২ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। এর ৪০ শতাংশের বেশি একাই পরিবহন করেছে চীনের বন্দরগুলো। অর্থাৎ বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে চীনের আধিপত্য অটুট আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে ভারতের দুটি বন্দর এই তালিকায় জায়গা পেয়েছে। দেশটির মুন্দ্রা বন্দর ২৫তম ও জওহরলাল নেহরু বন্দর ৩০তম অবস্থানে আছে। পাকিস্তানের করাচি বন্দরের অবস্থান ৮৪তম। সে হিসাবে করাচির চেয়ে ১৬ ধাপ এগিয়ে আছে চট্টগ্রাম।
এই অঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার বন্দর শ্রীলঙ্কার কলম্বোর অবস্থান ২৯তম।
দক্ষিণ এশিয়ায় চট্টগ্রামের ওপরে রয়েছে কলম্বো, মুন্দ্রা ও জওহরলাল নেহরু বন্দর। চট্টগ্রামের নিচে আছে করাচি। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রধান কনটেইনার বন্দরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান মাঝামাঝি।
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়মিতভাবেই বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় জায়গা পাচ্ছে। দেশের সমুদ্রপথে যত কনটেইনার পরিবহন করা হয়, তার প্রায় ৯৯ শতাংশই হয় এই বন্দর দিয়ে। বাকি প্রায় ১ শতাংশ পরিবহন করা হয় মোংলা বন্দর দিয়ে।
কনটেইনারের সংখ্যায় সেরা বন্দরের তালিকা প্রথম প্রকাশ করে কার্গো সিস্টেমস নামের সংস্থা। এরপর কনটেইনারাইজেশন ইন্টারন্যাশনাল ও সর্বশেষ এক দশকের বেশি সময় ধরে লয়েডস লিস্ট এই তালিকা প্রকাশ করে আসছে। ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৯৫তম।
গত এক দশকে লয়েডস লিস্টের ক্রমতালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে ভালো অবস্থান ছিল ৫৮তম। ২০২০ সালে প্রকাশিত তালিকায় এই অবস্থানে উঠেছিল চট্টগ্রাম। এই সময় চট্টগ্রাম বন্দর ৩৭ ধাপ এগোলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই অগ্রগতি ধরে রাখা যায়নি। যদিও এই সময় কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ বেড়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রতিবছর কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে। এখন জ্বালানিসংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমসের সেবা বাড়ানো গেলে এই প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে।
আমিরুল হক আরও বলেন, আশার দিক হলো, চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে আবার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। নতুন টার্মিনাল হচ্ছে। এগুলো চালু হলে বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে।
চট্টগ্রামের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো নয়; বরং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর তুলনায় আরও দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নতুন টার্মিনাল ও বিদেশি অপারেটরদের বিনিয়োগের কল্যাণে চট্টগ্রাম কতটা এগিয়ে যেতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।