
জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করল। ইপিএ চুক্তির ফলে বাজারটিতে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ পাবে।
আজ শুক্রবার জাপানের টোকিওতে বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও এই চুক্তি সই করেন। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিসহ উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এক তথ্য বিবরণীতে বাংলাদেশের তথ্য অধিদপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে ঢাকা ও টোকিওতে অনুষ্ঠিত সাত দফা দর-কষাকষির ফল হচ্ছে এই চুক্তি।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন তাঁর বক্তব্যে ইপিএ চুক্তিকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ইপিএ চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আমাদের দুই দেশের মধ্যে গভীর পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তিনি আশা ব্যক্ত করেন, এই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন পারস্পরিক সমৃদ্ধির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে।
চুক্তিটির অধীনে বাংলাদেশ পণ্য ও সেবা উভয় বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে। বিনিময়ে বাংলাদেশও জাপানের জন্য তার বাজার সম্প্রসারিত করছে। ফলে বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।
ইপিএ চুক্তি অনুযায়ী, পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা যুক্ত হওয়ায় এখন থেকে কাঁচামাল নিয়ে কোনো জটিল শর্ত ছাড়াই বাংলাদেশি পোশাক খুব সহজে জাপানে রপ্তানি করা যাবে। পাশাপাশি জাপানের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং এবং নার্সিংয়ের মতো প্রায় ১৬টি বিভাগে ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের মানুষের জন্য জাপানে অধিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ জাপানের জন্য ১২টি বিভাগের আওতায় ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি, এটি উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং লজিস্টিকস প্রভৃতি খাতে জাপানি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ হলে আমাদের দেশীয় পণ্যের মান বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশ এবং একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে এই চুক্তি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে, এমনটা বলা হয় তথ্য বিবরণীতে।
ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যচুক্তি নেই। জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়া শুরু করবে। বাংলাদেশ-জাপান ইপিএর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে। তখন দর-কষাকষির ভিত্তি তৈরিতে গঠন করা হয় যৌথ গবেষণা দল। ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর দলটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১৭টি খাত তুলে ধরে সমন্বিতভাবে দর-কষাকষির পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী আলোচনা এগোয়।
২০২৪ সালের ১২ মার্চ উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইপিএ নিয়ে দর-কষাকষির ঘোষণা দেয় এবং মে মাসে ঢাকায় প্রথম রাউন্ডের আলোচনা শুরু করে। একই বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আলোচনা থমকে যায়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে আলোচনায় বসে এবং এক বছরের মধ্যে চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
এরপর ঢাকা-টোকিও-ঢাকা—এভাবে মোট সাত দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বর ঢাকায় দ্বিতীয়, ডিসেম্বরে টোকিওতে তৃতীয় রাউন্ড আলোচনা হয়। ২০২৫ সালে ঢাকায় চতুর্থ, টোকিওতে পঞ্চম, ঢাকায় ষষ্ঠ এবং সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে টোকিওতে সপ্তম ও চূড়ান্ত রাউন্ডের আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২২ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের কথা জানায়।