গবেষণা সংস্থা সিপিডি ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘দেশের উন্নয়ন: নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত অতিথিরা। আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক ইন সেন্টারে
গবেষণা সংস্থা সিপিডি ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘দেশের উন্নয়ন: নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত অতিথিরা। আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক ইন সেন্টারে

সিপিডির গোলটেবিলে অর্থ উপদেষ্টা

‘ভোগ নিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধির মডেল থেকে বিনিয়োগনির্ভর মডেলে যেতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে দেশে একটা ভোগ নিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধি মডেলের বয়ান চালু ছিল। কিন্তু এই মডেল কখনোই টেকসই হওয়ার কথা না। আমরা দ্রুততার সঙ্গে ভোগ নিয়ন্ত্রিত মডেল থেকে বিনিয়োগনির্ভর মডেলে যেতে চাই।’

আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন: স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

অনুষ্ঠানে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পুরোনো মডেলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল অতিমাত্রায় ঋণনির্ভরতা। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণের পাহাড় গড়ে উঠেছে। এটি কোনোভাবেই টেকসই নয়। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের স্থবির বা ঋণাত্মক ছিল। এই দুই সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন।

‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা জানান, নতুন সরকার গঠনের ১০ দিনের মধ্যেই অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার দিক বিবেচনা করে ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। দারিদ্র্য পরিস্থিতি কমাতে ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা কাজ করছি। পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে বেতন পরিশোধে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশে এবারই প্রথম আন্দোলন করা ছাড়া তৈরি পোশাক খাত ঈদ মৌসুম পার করতে যাচ্ছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমাদের রাজস্ব নীতির বড় দুর্বলতা হচ্ছে লিকেজ বা ফাঁকি। যেমন সামাজিক সুরক্ষা খাতে যাঁদের থাকার কথা, তাঁদের অনেকে তালিকাভুক্ত হননি। আবার যাঁদের থাকার কথা না, তাঁরা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। আবার এই কর্মসূচিগুলো ছড়ানো–ছিটানো। এই ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান হলো, ভবিষ্যতে ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া আর কোনো সেবা দেওয়া হবে না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড”।’

ভবিষ্যতে ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া আর কোনো সেবা দেওয়া হবে না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা

‘জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ান’

দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে সরকারকে সবার আগে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও হা–মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের সংযোগ না পাওয়ায় আমরা নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারছি না। ফলে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না।’ এ সময় খেলাপি ঋণ নিয়েও কথা বলেন এ কে আজাদ। তিনি বলেন, যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে অর্থনীতি ভালো হবে না।

নতুন সরকারকে দুটি পরামর্শ দেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘আমলাতন্ত্র আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে খুব ভালো, অনেক ক্ষেত্রে বাধা। আমলাতন্ত্রকে পরিচালনা করা নতুন সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়, দপ্তরে ডিজিটালাইজেশন জরুরি। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে একটা অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (উপদেষ্টা কমিটি) করা, যারা প্রতি তিন মাস পরপর সরকারকে পরামর্শ দেবে এবং সরকারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।’

বৈঠকে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান সমস্যা নীতিসংক্রান্ত। সরকার যে নীতি তৈরি করে, সেখানে অংশীজনদের যথাযথভাবে যুক্ত করা হয় না। এই মনোভাব বদলানো দরকার।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, রাজস্ব, বৈদেশিক লেনদেন ও ব্যাংকিং—এই তিন খাতে একযোগে ও সমন্বিত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফেরানো সম্ভব নয়। কাজটি কঠিন হলেও দেরি করার সুযোগ নেই।

যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না
এ কে আজাদ, সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই

কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে

নতুন সরকার ১৮০ দিনের মধ্যে বড় আকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাইলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত হবে না বলে জানান মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাত ও স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, নতুন শিল্প স্থাপন করে অল্প সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি শিল্প স্থাপনে জমি কেনা থেকে শুরু করে মালিকানা জটিলতা, অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আমদানি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ—সব মিলিয়ে বহু বছর সময় লাগে। তাই আগামী ১৮০ দিনে অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়ার বদলে যেসব শিল্প ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে, সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করা যায়।

এ প্রসঙ্গে বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি করা কঠিন হবে। তাই বিকল্প হিসেবে আগামী দুই থেকে তিন বছরে ৩০ থেকে ৪০ লাখ দক্ষ কর্মী বিদেশে নতুন বাজারে পাঠানোর পথনকশা তৈরি করা যেতে পারে।

খেলাপির বিষয়ে কঠোর হতে হবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মাইন উদ্দিন বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বাজেট বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ভবিষ্যতে ঋণ নিতে হলে তা অবশ্যই স্বল্প সুদ ও কনসেশনাল (বিশেষ শর্ত) হতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক আসিফ ইব্রাহীম, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম, বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান, পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অমৃতা মাকিন ইসলাম, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার, জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি, বাংলাদেশের (নাসিব) সভাপতি মির্জা নূরুল গণী শোভন প্রমুখ।