দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোল দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্য টানা তিন অর্থবছর ধরে কমছে। বিশেষ করে গত অর্থবছরে রপ্তানিতে বড় ধস নেমেছে।
এক বছরের ব্যবধানে ভারতে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ কমেছে ৫৩ শতাংশ এবং রপ্তানি মূল্য কমেছে ৬৯ শতাংশ। একই সময়ে আমদানিও কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বন্দরের রাজস্ব আদায়েও।
শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত তিন অর্থবছরে (২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬) এ বন্দর দিয়ে মোট ৪৭ লাখ ১৭ হাজার ৩৬৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৮১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, সাফটা সুবিধায় আমদানি বেড়ে যাওয়ায় গড় শুল্কহার কমেছে। ফলে আমদানি পণ্যের পরিমাণ কমার পাশাপাশি শুল্ক আদায়েও চাপ তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিতে বড় ধস
গত তিন অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে মোট ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছে। যার মোট শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ২৯ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়। যার আর্থিক মূল্য ১১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ১ হাজার ৩৬৬ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়। যার আর্থিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকায়।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের ধাক্কা খায়। রপ্তানির পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ১ লাখ ৮৮ হাজার ২০৯ মেট্রিক টনে; রপ্তানি মূল্য কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ১৩২ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ ৫৩ দশমিক ১১ শতাংশ এবং রপ্তানি মূল্য ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মোট ৩ হাজার ৬০০ ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে।
বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মতিয়ার রহমান বলেন, ‘দেশের ব্যবসা–বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতির পাশাপাশি দুই বছর ধরে দেশের ব্যবসায়ীরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। নতুন করে শুরু হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে অবস্থা আরও করুণ ছিল; এখন কিছুটা উত্তরণ হচ্ছে।’
আমদানি কত
বেনাপোল বন্দর দিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭ লাখ ২১ হাজার ৪৪১ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ২৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৯৫৩ মেট্রিক টন। তবে পণ্যের মূল্য কিছুটা বেড়ে হয় ২৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিমাণের দিক থেকে আমদানি আরও কমে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ২ হাজার ৯৬৯ মেট্রিক টন। যার মূল্য ছিল ২৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত তিন বছরের ব্যবধানে বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, তুলনামূলকভাবে সাফটা (দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা) সুবিধার আওতায় পণ্য আমদানি বেড়েছে। সাফটা সুবিধায় (সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সহায়তা) আমদানি পণ্যে শুল্কহার কমে যায়। ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা এখন বেশি ব্যবহার করছেন। সে কারণে রাজস্ব আয় কমছে।
গত তিন বছরের মধ্যে গত অর্থবছরের সাফটা সুবিধায় সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। মোট পণ্য চালানের
৩৫ শতাংশ এসেছে এই সুবিধায়। এর আগের বছরগুলোতে যা ছিল যথাক্রমে ১১ ও ৭ শতাংশ। আমদানিকারকেরা দিন দিন এই সুবিধা বেশি ব্যবহার করছেন বলে কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে।
বাণিজ্যের এই নিম্নমুখী ধারার বিষয়ে জানতে চাইলে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি রপ্তানি কেন কমছে, সেটা ব্যাখ্যা করা কাস্টমস বিভাগের কাজ নয়। এটা ব্যাংক কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীরা বলতে পারবেন। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে আমরা এনবিআরের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে থাকি। পণ্য আমদানি-রপ্তানি কমলে রাজস্ব আয়ও কমে যায়।’
ফাইজুর রহমান আরও বলেন, ‘চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে পণ্য আমদানি করলেও রাজস্ব বেড়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, শুল্কমুক্ত পণ্য বেশি আমদানি হচ্ছে। যেমন গত বছর চাল আমদানি শুল্কমুক্ত ঘোষণা করা হয়। আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে আছে তুলা। এটিও শুল্কমুক্ত। বর্তমানে সাফটা সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীরা বেশি পণ্য আমদানি করছেন। এতে শুল্ক কম। দিন দিন এই সুবিধা নেওয়ার হার বাড়ছে। ফলে রাজস্ব আদায় কমছে।’
রপ্তানির শীর্ষ পণ্য
বেনাপোল দিয়ে ভারতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হলেও সম্প্রতি রপ্তানি পণ্যের তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচাপাট ও তৈরি পোশাকের মতো পণ্য রপ্তানির শীর্ষে থাকলেও পরের অর্থবছরে এসব পণ্যের রপ্তানি কমে যায়। বিপরীতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, সুপারি, মাছ, সুতি ও ঝুটের মতো কয়েকটি পণ্য শীর্ষে উঠে আসে।
আমদানির শীর্ষ পণ্য
বেনাপোল দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের তালিকায় শিল্পের কাঁচামাল ও কৃষিপণ্যের আধিপত্য রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির শীর্ষে ছিল স্পঞ্জ আয়রন ও তুলা। এ ছাড়া ফলমূল, চাল, ফেরো-সিলিকো-ম্যাঙ্গানিজ, গ্রানাইট ও স্টিল রডের মতো পণ্যও শীর্ষ তালিকায় ছিল।
বন্দরের বাণিজ্যিক মন্দা নিয়ে বেনাপোলের ব্যবসায়ীরা বলেন, বেনাপোল বন্দরের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। একই সঙ্গে ওপারের পেট্রোপোল বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া সহজ করা না গেলে বেনাপোলের বাণিজ্যে গতি ফেরানো কঠিন হবে।