চার বছর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের গম আমদানির উৎস বদলাতে শুরু করেছিল। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা গেল সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে। প্রথমবারের মতো রাশিয়া ও ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের গম আমদানির শীর্ষ উৎসে পরিণত হয়েছে আর্জেন্টিনা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরের তুলনায় গম আমদানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। মোট আমদানি হওয়া গমের প্রায় ৩০ শতাংশই এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে।
একসময় বাংলাদেশের গম আমদানির প্রধান দুই উৎস ছিল রাশিয়া ও ইউক্রেন। প্রায় প্রতি অর্থবছরেই দেশ দুটির একটি শীর্ষে থাকত। কিন্তু ২০২২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় আমদানিকারকেরা গমের বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই বিকল্পই এখন প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
যেভাবে শীর্ষে আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনা আগে থেকেই বাংলাদেশের গমের একটি উৎস ছিল। তবে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি থেকে আমদানি দ্রুত বাড়তে থাকে। তাতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের গম আমদানি চতুর্থ শীর্ষ দেশের তালিকায় ছিল আর্জেন্টিনার অবস্থান। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রথমবার শীর্ষে উঠে এসেছে দেশটি।
এনবিআরের হিসাবে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে আর্জেন্টিনা থেকে ২২ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। মোট আমদানিতে দেশটির অংশীদারত্ব প্রায় ৩০ শতাংশ।
অন্যদিকে রাশিয়া থেকে আমদানি কমে নেমে এসেছে ১৬ লাখ ৭৯ হাজার টনে, যা মোট আমদানির ২৩ শতাংশ। অথচ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট গম আমদানির ৪৪ শতাংশই এসেছিল রাশিয়া থেকে।
বাংলাদেশে এত দিন আর্জেন্টিনা থেকে সয়াবিন তেল বেশি আমদানি হতো। এবার সেই তালিকায় বড় পরিসরে যুক্ত হয়েছে গম। আগে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশটি থেকে গম আনলেও গত অর্থবছরে আর্জেন্টিনা থেকে গম আমদানি করেছে ৪৬টি প্রতিষ্ঠান। আমদানিকারক এসব প্রতিষ্ঠানের একটি ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর ওই দুই দেশ থেকে গম আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই সরবরাহ ঝুঁকি কমাতেই আমরা আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে বিকল্প উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম।’
* সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে আর্জেন্টিনা থেকে আমদানি করা হয়েছে ২২ লাখ টন গম, যা মোট আমদানির ৩০%।* একই অর্থবছরে কানাডা থেকে এসেছে ১৬ লাখ ৭০ হাজার টন গম, যা মোট আমদানির সাড়ে ২২%।
পিছিয়ে ব্রাজিল
বাংলাদেশে নরম গমের অন্যতম উৎস রাশিয়া, ইউক্রেন, আর্জেন্টিনা, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও ব্রাজিল। বাংলাদেশে রাশিয়া–ইউক্রেনের বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করেছে আর্জেন্টিনা। তবে ব্রাজিলও তাদের অংশীদারি বাড়িয়েছে, তবে অনেক ধীরগতিতে।
সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে ৪ লাখ ৭৬ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা মোট আমদানির ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশটি থেকে মোট আমদানির ২ শতাংশ এসেছিল। ওই সময় বাংলাদেশে আমদানি হওয়া গমে বাজারে সপ্তম অবস্থানে ছিল ব্রাজিল। আর সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে সপ্তম অবস্থান থেকে পঞ্চম অবস্থানে উঠে এসেছে দেশটি।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে গড়ে সবচেয়ে কম দামে গম সরবরাহ করেছে ব্রাজিল। দেশটি থেকে টনপ্রতি গম আমদানি হয়েছে ২৫৫ ডলারে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এই দাম ছিল ২৫৭ ডলার, অর্থাৎ তুলনামূলক কম দামেও ব্রাজিল বাংলাদেশের বড় উৎসে পরিণত হতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন
উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ শক্ত গমের প্রধান উৎস কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরনের গমের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ এখনো কানাডা। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে কানাডা থেকে ১৬ লাখ ৭০ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা মোট আমদানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে দেশটি বাংলাদেশের গম আমদানির উৎস দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
কয়েক বছর বিরতির পর আবার বাংলাদেশের গমের বাজারে ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশটি থেকে কোনো গম আমদানি হয়নি। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার টন গম, যা মোট আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ। এতে দেশটি চতুর্থ বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে।
মূলত সরকারিভাবে গম আমদানির কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব বেড়েছে। দেশটি থেকে আমদানি হওয়া মোট গমের ৯৫ শতাংশই এনেছে সরকার। বাকি ৫ শতাংশ আমদানি করেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
আমদানিকারকদের মতে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বাংলাদেশের গম আমদানির উৎসে বড় বৈচিত্র্য এনেছে। আগে যেখানে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি, এখন সেখানে আর্জেন্টিনা, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এতে সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো বাংলাদেশের গম আমদানিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে।