বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য

সেবা রপ্তানি এখনো কম, আয় বেড়েছে ৪ শতাংশ

বাংলাদেশি পণ্যের পাশাপাশি সেবা রপ্তানি হয়। যদিও পণ্যের তুলনায় সেবা খাতের রপ্তানি আয় সামান্য—৬ ভাগের ১ ভাগ। আবার পণ্য রপ্তানির চেয়ে সেবা খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধিও কম। গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি প্রায় ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও সেবা রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৪ শতাংশ।

বিদায়ী অর্থবছর সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় সরকারি বিভিন্ন সেবা ও পরিবহন সেবা থেকে এসেছে। এ ছাড়া ভ্রমণ, টেলিযোগাযোগ উপখাত থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি আয় এসেছে। তবে কিছু খাতে সেবা রপ্তানি কমেছে।

পণ্য ও সেবা রপ্তানি আয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পণ্য ও সেবা খাত মিলিয়ে মোট রপ্তানি আয় এসেছে প্রায় ৫ হাজার ৪৭ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি আয় প্রায় ৪ হাজার ৩৫৬ কোটি ডলার। আর সেবা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৬৯১ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সেবা খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ।

বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা থেকে বাংলাদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, সেটিকেই সেবা রপ্তানি আয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন দেশীয় কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি বিদেশি গ্রাহককে সফটওয়্যার বানিয়ে দিলে, ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে আয়, বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশে ভ্রমণ কিংবা কনটেইনার পরিবহন বা কার্গো সেবা থেকে আসা আয়কে সেবা রপ্তানি আয় হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, তিন বছর ধরে সেবা খাতের রপ্তানি উত্থানের মধ্যে রয়েছে। করোনার পর ২০২২–২৩ অর্থবছরে সেবা খাতের রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪০ কোটি ডলার। পরের বছর সেটি সাড়ে ৬ শতাংশ কমে ৬৬৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। বিদায়ী বছর সেবা রপ্তানি আবার বাড়ে।

কোন খাতে কত আয়

বাংলাদেশের ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সেবা খাতে সরকারি বিভিন্ন সেবার বিপরীতে সবচেয়ে বেশি ১৫৬ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় এসেছে। এই রপ্তানি এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম। এ ছাড়া গত অর্থবছরে সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে পরিবহন আয়ে। রপ্তানি আয় হয়েছে ১৪৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৪৪ শতাংশ।

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় রপ্তানি আয় হয়েছে ৭৪ কোটি ডলার, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট সেবায় ৭২ কোটি, ভ্রমণে ৪৫ কোটি ও মার্চেন্ডাইজিং সেবায় ৯৮ লাখ ডলার রপ্তানি আয় এসেছে। গত অর্থবছর তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় প্রায় ১০ শতাংশ, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট সেবায় ২৭ শতাংশ, ভ্রমণে দেড় শতাংশ, মার্চেন্ডাইজিংয়ে ১৬ শতাংশ এবং বিমা সেবা খাতে প্রায় ২৪ শতাংশ রপ্তানি আয় বেড়েছে।

আয় কমেছে যেসব সেবায়

কয়েকটি সেবা রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। গত অর্থবছরে নির্মাণ সেবায় আয় হয়েছিল ৩৩ কোটি ডলার। এই আয় তার আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ কম। এ ছাড়া বন্দরভিত্তিক পণ্য পরিবহন ও সংগ্রহ সেবা থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ১৫ কোটি ডলার। এই রপ্তানি এর আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ কম।

রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত সেবার আয় কমেছে ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া আর্থিক সেবা খাতে (বিমা ছাড়া) আয় কমেছে ৭ শতাংশের বেশি। মেধাসম্পদ বিক্রি বা ব্যবহার থেকে যে আয় পাওয়া যায়, সেটিও গত অর্থবছরে কমেছে ১১ শতাংশ।

নীতিগতভাবে সেবা খাতে রপ্তানি বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে এটি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি সেবা খাত সম্প্রসারণে যে ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন, সেদিকেও পর্যাপ্ত নজর দেওয়া হয়নি
মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ

আয় আসায় শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র

পণ্য রপ্তানির মতো সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংশীদার। বাংলাদেশের মোট সেবা রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত অর্থবছর দেশটিতে বিভিন্ন সেবা রপ্তানি করে ১০২ কোটি ডলার আয় করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হংকং থেকে ৭১ কোটি ও তৃতীয় সর্বোচ্চ সিঙ্গাপুর থেকে ৫৯ কোটি ডলার আয় হয়। এর বাইরে চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে সেবা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি আয়ে পণ্য খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি করতে সেবা রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ খাতের অবদান আরও বাড়ানো সম্ভব।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা এখন অত্যন্ত জরুরি হলেও আলোচনাটি প্রায়ই পণ্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে ওষুধ বা কৃষি-প্রক্রিয়াজাতের মতো খাত নিয়ে ভাবা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সেবা খাতকে এখনো যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মাসরুর রিয়াজ বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হার বর্তমানে পণ্য বাণিজ্যের চেয়েও দ্রুত। বিশেষ করে ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেবা রপ্তানি, বিশেষত ডিজিটাল সেবার রপ্তানি আগামী দিনে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মূল্য সংযোজনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সেবা খাতের রপ্তানি একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মাসরুর রিয়াজ জানান, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো প্রস্তুতি ও কৌশলগত মনোযোগ বাংলাদেশে এখনো খুবই সীমিত। নীতিগতভাবে সেবা খাতে রপ্তানি বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে এটি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি সেবা খাত সম্প্রসারণে যে ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন, সেদিকেও পর্যাপ্ত নজর দেওয়া হয়নি।