
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (বিজেইপিএ) স্বাক্ষরের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই চুক্তি অনুমোদিত হয়। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি জাপান এই চুক্তি স্বাক্ষর করতে ইচ্ছুক। উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদনের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুফল বয়ে আনবে। এই চুক্তির ফলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি এবং উভয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি স্বাক্ষর করতে ৪ ফেব্রুয়ারি টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, বিজেইপিএর মাধ্যমে বাংলাদেশের ৯৭টি উপখাত উন্মুক্ত হবে জাপানের জন্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হবে জাপানের ১২০টি উপখাত আর চুক্তি সইয়ের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে বিজেইপিএর উদ্যোগ নেওয়া হয়। দর-কষাকষির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে তখন গঠন করা হয় যৌথ গবেষণা দল। ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর যৌথ গবেষণা দল তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ১৭টি খাত অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে দর-কষাকষি পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ উভয় দেশ দর-কষাকষি শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারণে এই দর-কষাকষি প্রক্রিয়া কয়েক মাস থমকে থাকলেও ওই বছরের নভেম্বর থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দর-কষাকষির কার্যক্রম নতুন করে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সঙ্গে এক বছরের মধ্যে চুক্তি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এরপর দুই পক্ষের আলোচনা চলতে থাকে। ঢাকায় দ্বিতীয় রাউন্ডের আলোচনা শুরু হয় ২০২৪ সালের ১০ থেকে ১৪ নভেম্বর। টোকিওতে তৃতীয় রাউন্ড আলোচনা হয় ওই বছরের ১৯ থেকে ২০ ডিসেম্বর।
জানা যায়, ২০২৫ সালে আলোচনা হয় চারটি। ঢাকায় চতুর্থ রাউন্ডের আলোচনা হয় গত বছরের ২ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি। টোকিওতে পঞ্চম রাউন্ডের আলোচনা হয় ২০ থেকে ২৬ এপ্রিল। ঢাকায় ষষ্ঠ রাউন্ডের আলোচনা হয় ২১ থেকে ২৬ জুন এবং এ আলোচনায় চুক্তির বিষয়গুলো স্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করে। টোকিওতে ৩ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সপ্তম ও চূড়ান্ত রাউন্ডের আলোচনা শেষে উভয় দেশ চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর সরাসরি সম্পৃক্ততা বিজেইপিএ দর-কষাকষির দ্রুত অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার ক্ষেত্রে বিজেইপিএ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এতে শুধু বাজারসুবিধা নয়, সেবা খাতের দুয়ারও খুলবে। চীন থেকে জাপান তার বিনিয়োগ সরিয়ে আনছে। এটা কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৭ নভেম্বর জাপান অবশ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) দেওয়া এক নোটিফিকেশনে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসি ও এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলোকে জিএসপি সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে, যে সুবিধা বাংলাদেশও পাবে। সে বিবেচনায় বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চুক্তি করতে এত তাড়াহুড়া করার দরকার ছিল না।