একসময় পকেট বা মানিব্যাগ ভর্তি ছিল কাগুজে নোটে। ধীরে ধীরে সেই জায়গা দখল করছে বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড। বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম ক্রেডিট কার্ডের সূচনা করলেও বর্তমানে এই প্রযুক্তি বিবর্তনের এক অনন্য ধাপে দাঁড়িয়ে। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের এই রূপান্তরে ভূমিকা রাখছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো।
সম্প্রতি দেশের বাজারে প্রথম বায়োমেট্রিক মেটাল ক্রেডিট কার্ড চালু করে সেই বিবর্তনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল)। দেশে ইএমভি চিপযুক্ত কার্ড, কন্ট্যাক্টলেস কার্ড এবং ভার্চ্যুয়াল কার্ড চালুর ক্ষেত্রে ইবিএল প্রথম সারির ব্যাংকগুলোর একটি। বর্তমানে গ্রাহকেরা প্লাস্টিক কার্ডের বদলে মুঠোফোনে অ্যাপের মাধ্যমে সেরে নিচ্ছেন নিরাপদ লেনদেন। তবে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, গ্রাহকের সচেতনতার গুরুত্বও তত বাড়ছে। এ জন্য ব্যাংকগুলো নিয়মিত সাইবার সিকিউরিটি কমিউনিকেশন ও ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিনিয়ত অগ্রগতির এই যুগে ব্যাংকিং সেবাকে আরও আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব করতে যোগ হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। ইস্টার্ন ব্যাংকের ‘স্কাই ব্যাংকিং’ অ্যাপের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন এআই ব্যবহার করে গ্রাহকের কাজ আরও সহজ করে দিচ্ছে। এখন আর ব্যালেন্স চেক বা ফান্ড ট্রান্সফারের জন্য ব্যাংকে দৌড়াতে হয় না। এমনকি চ্যাটবটের মাধ্যমে যেকোনো জিজ্ঞাসার তাৎক্ষণিক সমাধান মিলছে, যা কল সেন্টারের ওপর চাপ কমিয়ে গ্রাহকের মূল্যবান সময় বাঁচাচ্ছে। এ ছাড়া তাদের ‘পারসোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট’ বা পিএফএম ফিচারটি গ্রাফিক্যাল রিপ্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে গ্রাহকের খরচের চিত্র তুলে ধরে এবং বাজেট ম্যানেজ করতে সাহায্য করে।
পিএফএম প্রযুক্তি সরাসরি কার্ডের খরচের ওপর গ্রাহকের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। যেমন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক তাদের ‘এমটিবি নিও’ প্ল্যাটফর্মে এনেছে এআই-চালিত ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্স। ব্যাংক কার্ড হারিয়ে গেলে বা পেমেন্ট ব্লক করার মতো জরুরি প্রয়োজনে এখন আর কল সেন্টারে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না; এআইয়ের মাধ্যমেই মুহূর্তের মধ্যে কার্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অন্যদিকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং প্রাইম ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কার্ড–গ্রাহকদের জন্য রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং এবং স্মার্ট বাজেট নোটিফিকেশন সুবিধা দিচ্ছে। কেনাকাটা বা লেনদেনের সময় গ্রাহকের নির্ধারিত বাজেটের সীমা অতিক্রম করতে থাকলে এআই সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পাঠাবে। এআই প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এসব সেবার ফলে কার্ড এখন শুধু অর্থ পরিশোধের মাধ্যম নয়, বরং সাশ্রয়ী জীবনযাপনেরও আধুনিক সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
এআই শুধু গ্রাহকের কার্ডের খরচই নিয়ন্ত্রণ করছে না, এটি লেনদেনকে করেছে আরও স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদ। যদি আপনার কার্ড দিয়ে হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিক বা বড় অঙ্কের লেনদেনের চেষ্টা করা হয়, এআই মুহূর্তেই তা শনাক্ত করে গ্রাহককে জানিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের স্মার্ট কার্ডগুলো শুধু প্লাস্টিকের টুকরা নয়, বরং হয়ে উঠবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এমন এক সঙ্গী, যা ব্যবহারকারীর আয়–ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। যাঁরা ‘মাস শেষের আগেই পকেট খালি’ হওয়ার সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের জন্য এআই–চালিত এই স্মার্ট কার্ডগুলো হতে যাচ্ছে ‘স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্স’।
ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির এই বিবর্তন লেনদেনকে সহজ করার পাশাপাশি গ্রাহকের হাতে তুলে দিয়েছে আর্থিক নিয়ন্ত্রণও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন কেবল পর্দার পেছনের কোডিং নয়, পাশাপাশি হয়ে উঠছে আপনার পকেটে থাকা ‘ব্যক্তিগত উপদেষ্টা’। প্রযুক্তির এই মেলবন্ধনই বলে দিচ্ছে, আগামী দিনের ব্যাংক কার্ডগুলো কেবল টাকা খরচের মাধ্যম হবে না, বরং আপনার সম্পদ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বুদ্ধিমান অংশীদারও হয়ে উঠবে।