
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলকে দেশের নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে একের পর এক নীতিগত সংস্কার, অর্থায়ন, কর-সুবিধা, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগের পথে থাকা বড় বাধাগুলো ইতিমধ্যে দূর করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে এগিয়ে আসা।
আজ মঙ্গলবার রাজশাহী প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে আয়োজিত আঞ্চলিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও সুইসকন্ট্যাক্ট যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
অন্তর্বর্তী সংকট কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শুধু পুনরুদ্ধার নয়, পুনর্গঠন করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা তিতুমীর। তিনি বলেন, এ লক্ষ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ এবং সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই দর্শনের ভিত্তিতে কাজ করছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নকে অন্যতম অঙ্গীকার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলিত অঞ্চলগুলোকে মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতেই সরকার অঞ্চলভিত্তিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
এ প্রসঙ্গে তিতুমীর আরও বলেন, ‘যারা পিছিয়ে আছে, তাদের সামনের সারিতে নিয়ে আসাই আমাদের লক্ষ্য। তাই অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।’
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১২৩ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা) অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে সরকার বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, প্রথমত, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সে জন্য এবারের বাজেটে পাঁচ বছরের করকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী সব পণ্যের জন্য সমতাভিত্তিক করসুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘একজন বিনিয়োগকারীকে অন্তত পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হয়। রাষ্ট্রের নীতি কী হবে, সেই নিশ্চয়তা আমরা দিচ্ছি।’
দ্বিতীয়ত, ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ শিথিল (ডিরেগুলেশন) করা হচ্ছে। লাইসেন্স গ্রহণ থেকে কারখানা চালু হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে ট্র্যাক করা যাবে।
‘সরকার ব্যবসা করতে চায় না। সরকারের কাজ পথ তৈরি করে দেওয়া, পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো নয়’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, অতীতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে।
অর্থায়নের বিষয়ে উপদেষ্টা তিতুমীর বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়মে ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুটি খাতেই এখন বড় ধরনের সংস্কার চলছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়নের জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে।
উপদেষ্টা তিতুমীর জানান, বর্তমানে ৪৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন–সুবিধা রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের জন্য বিশেষ উদ্যোগের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, উত্তরাঞ্চলে কৃষি হাব তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তিন হাজার কোটি টাকা বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার তথ্য অনেক উদ্যোক্তার কাছেই পৌঁছায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল করা হচ্ছে বলে জানান এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এতে এনবিআরের কর্মকর্তাদের কাছে বারবার যেতে হবে না; পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আসবে। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কর আদায় হবে, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমবে।
বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নের কথা উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, এখন উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রাজস্ব আয় বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সরকার শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্বল্পমূল্যের জ্বালানি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সরকার এখন জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, রাজশাহীতে জায়গার কোনো সংকট নেই। সরকারি-বেসরকারি ভবন ও শিল্পকারখানার ছাদে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যেই বিনিয়োগ উঠে আসে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে সরকারি অফিস থেকেই সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুরু করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের পণ্য দ্রুত চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরে পৌঁছাতে রেলপথ আধুনিকায়নের কাজ চলছে। ব্রডগেজ ও মিটারগেজের সীমাবদ্ধতা দূর করে ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ড. তিতুমীর বলেন, পঞ্চগড় থেকে বন্দর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।
উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, উত্তরাঞ্চল শুধু কৃষিপণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে থাকলে চলবে না; কৃষিভিত্তিক শিল্পও গড়ে তুলতে হবে। আলু, ভুট্টা, আম, লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। আলু থেকে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), দুগ্ধভিত্তিক শিল্প, মোজারেলা চিজ, ফুলভিত্তিক শিল্প এবং নুড়ি-পাথরভিত্তিক নতুন শিল্প গড়ে তোলারও সম্ভাবনা রয়েছে।
তিতুমীর বলেন, উত্তরাঞ্চলে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে, বিনিয়োগের পথের বাধা দূর করেছে। এখন উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকার এখন অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের উদ্যোক্তার জন্য আলাদা সহায়তা দিচ্ছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাথমিক উৎপাদকদের উদ্যোক্তায় রূপান্তর করতে হবে। বড় শিল্পের পাশাপাশি সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পেরও বিকাশ ঘটাতে হবে।
উপদেষ্টা জানান, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এর চেয়ে বড় নীতির ধারাবাহিকতা আর হতে পারে না।’
উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের বাধা দূর করতেও উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা চান অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, কারিগরি বাণিজ্য বাধা (টিবিটি), স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) ব্যবস্থার মতো অশুল্ক বাধা কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার কাজ করছে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সরকার পথ তৈরি করেছে, নীতিগত বাধাগুলো সরিয়েছে। এখন উত্তরাঞ্চলের উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান ও নতুন অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা বক্তব্য দেন।