জমি বা ফ্ল্যাটের মালিকানা হস্তান্তরে করণীয়

মাথাগোঁজার ঠাঁই কিংবা একফালি স্বপ্নপূরণে সবাই ফ্ল্যাটের দিকে ঝুঁকছেন। সঞ্চিত অর্থ কিংবা কিস্তিতে কিনছেন ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট কেনাতেই মিলছে স্বস্তি। এর কারণ হলো ফ্ল্যাট কেনার জন্য আলাদা করে জমি কেনা বা বাড়ি নির্মাণের ঝামেলা নেই। বর্তমানে এই ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণ ও বিক্রির জন্য রয়েছে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান বা ডেভেলপার কোম্পানি।

যাদের কাছ থেকে সরাসরি ফ্ল্যাট কেনা যায়। তবে এই আবাসন প্রতিষ্ঠান বা ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ফ্ল্যাট কেনার আগে ডকুমেন্ট যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন, বিশেষত চুক্তিপত্র। ফ্ল্যাট কেনার সময়, সেটা হস্তান্তর এবং রেজিস্ট্রেশনে কী কী বিষয়ে সচেতন হতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট কামাল মাহমুদ

ফ্ল্যাট কেনার আগে আপনাকে দেখতে হবে, যে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনতে চাচ্ছেন, সেই প্রতিষ্ঠানটি আইনানুগ নিবন্ধিত কি না। কাজের ক্ষেত্রে তাদের কোনো নেতিবাচক রেকর্ড আছে কি না। একটি ভালো ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে ফ্ল্যাট কেনা মানে অনেক ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক ডেভেলপারকে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পর কমপক্ষে এক বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। নির্মাণসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে মেরামতের প্রয়োজন হলে সেটা দুই বছর পর্যন্ত ডেভেলপার নিজ খরচে তা মেরামত করবেন। ২০১০ সালের ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন’–এর ১১ ধারা অনুযায়ী, হস্তান্তরের আগে অবশ্যই সব ধরনের ইউটিলিটি সার্ভিস, যেমন পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, অগ্নিনিরোধক-ব্যবস্থা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডেভেলপার কর্তৃক গ্রাহককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয় না কিংবা গ্রাহককে দিনের পর দিন ভোগান্তি করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গ্রাহক ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’–এর ১৫ ধারা অনুযায়ী চাইলে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে গ্রাহককে কিস্তির টাকা পরিশোধের ব্যাপারেও সাবধান থাকতে হবে। কারণ, গ্রাহকের ব্যর্থতার জন্য তাকেও একই আইনের ১৪ ধারার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ফ্ল্যাট কেনার পর সব দেনা বুঝিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট এবং হ্যান্ডওভার সার্টিফিকেট বুঝে নিতে হবে। ফ্ল্যাটটি যত দ্রুত সম্ভব রেজিস্ট্রেশন করে নিতে হবে। আইন অনুযায়ী, যে দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক অথচ রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি, তখন সেই দলিল নিয়ে আপনি কোনো দাবি করতে পারবেন না। সাবকবলা দলিল, হেবা বা দানপত্র, বন্ধকি দলিল, বায়না দলিল, বণ্টননামা দলিলসহ বিভিন্ন হস্তান্তর দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। দলিলের বিষয়বস্তু যে এলাকার অন্তর্ভুক্ত, সেই এলাকার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে।

জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য চুক্তিপত্র সম্পন্ন করা হলে তা রেজিস্ট্রি করতে হবে। জমির বায়নানামা সম্পাদনের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে বায়নাটি রেজিস্ট্রি করতে হবে। আর শর্ত অনুযায়ী বায়নার চুক্তির ভিত্তিতে রেজিস্ট্রি করার সব পদ্ধতি মেনে সাবকবলা দলিলটি সম্পাদিত হলে সম্পাদনের পর থেকে তিন মাসের মধ্যে সাবকবলা দলিলটি রেজিস্ট্রি করাতে হবে। আইন অনুযায়ী, তিন মাস পার হয়ে গেলে রেজিস্ট্রি করা যাবে না। তবে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আপিল করার সুযোগ আছে।

কোনো দলিল আইনগত ও যথাযথ পদ্ধতিতে সম্পাদনের পর রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমেই জমির সব দলিল-দস্তাবেজ ও মালিকানা যাচাই করতে হবে। দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে খসড়াটি ভালো করে যাচাই করতে হবে। দলিলে কোনো ভুল থাকলে ও রেজিস্ট্রি হলে এটি সংশোধনের ক্ষেত্রে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই করের মাত্রা কমানোর জন্য জমির দাম কম দেখানো হয়। এতে পরবর্তী সময়ে নানা রকম ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পরপরই নকল তুলতে হবে এবং এটি তুলে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে ভুলভ্রান্তি আছে কি না। দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় একটি রসিদ দেওয়া হয়। এই রসিদ মূল দলিল ওঠানোর সময় দেখাতে হয়। তাই রেজিস্ট্রেশনের এই রসিদ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যত্নে রাখতে হবে।