শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ‘হেয়ারকাটের’ সিদ্ধান্তে শতকোটি টাকার সুদ হারিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি যমুনা অয়েল। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের চারটিতে এ কোম্পানির বড় অঙ্কের আমানত রয়েছে। সেই আমানত এখন একীভূত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের বিপরীতে কোনো সুদ দেওয়া হবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, ব্যাংক একীভূত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রীতি মেনে সুদ না দেওয়ার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থাকে বলা হয়, হেয়ারকাট পদ্ধতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হেয়ারকাটের এ সিদ্ধান্তে যমুনা অয়েল চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় শতকোটি টাকার সুদ আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির মুনাফায়। শতকোটি টাকা সুদ আয় কমে যাওয়ায় কোম্পানিটির মুনাফা কমে গেছে। যমুনা অয়েলের অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে যমুনা অয়েল গতকাল সোমবার তাদের অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে। এর আগে গত রোববার কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস জুলাই–ডিসেম্বরে যমুনা অয়েল মুনাফা করেছে ২১৭ কোটি টাকা। এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানটি মুনাফা করেছিল ২৬৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে এই কোম্পানির মুনাফা কমেছে ৪৭ কোটি টাকা বা প্রায় ১৮ শতাংশ। সুদ আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোম্পানিটির ব্যবসাও কিছুটা কমেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যমুনা অয়েল আয় বা ব্যবসা করেছে ৮৯ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা কমেছে ৩ কোটি টাকা বা সোয়া ৩ শতাংশ। একদিকে ব্যবসা কমেছে, অন্যদিকে আমানতের সুদ আয় কমেছে। তার বিপরীতে বেড়েছে ব্যাংকের সুদসহ আর্থিক খরচ। সব মিলিয়ে উল্লেখিত সময়ে কোম্পানিটির সার্বিক মুনাফায় প্রভাব পড়েছে।
কোম্পানি–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যমুনা অয়েলসহ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর আয়ের বড় উৎস হলো ব্যাংক আমানতের সুদ আয়। মূল ব্যবসার চেয়ে এ খাত থেকে কয়েক গুণ বেশি আয় করে তেল কোম্পানিগুলো। তাই ব্যাংকের আমানতের সুদ আয় বাড়লে কোম্পানিগুলোর মুনাফাও হু হু করে বাড়তে থাকে। আর কোনো কারণে সুদ আয় কমে গেলে তা মুনাফার ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যমুনা অয়েল ব্যাংকে রাখা আমানতের সুদ বাবদ আয় করেছে ২৯৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে যমুনা অয়েলের সুদবাবদ আয় কমেছে ৮৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে ঋণের সুদসহ আর্থিক খরচ বেড়েছে ৭ কোটি টাকার বেশি। এই খাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর ছয় মাসে কোম্পানিটির খরচ হয়েছে ২৬ কোটি টাকার বেশি, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ কোটি টাকা।
যমুনা অয়েল জানায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রাখা আমানতের বিপরীতে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সুদ আয় হিসাবভুক্ত (অ্যাক্রু) না হওয়ায় কোম্পানির মুনাফা কমেছে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে হিসাবভুক্ত সুদ আয়ও আবার সমন্বয় (রাইট ব্যাক) করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের কারণে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত থেকে কয়েক বছরের সুদ আদায় সম্ভব হবে না—এমন ধারণার ভিত্তিতেই সুদ আয় সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি।
শরিয়াহভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া অন্য চারটি ব্যাংকে যমুনা অয়েলের বড় অঙ্কের আমানত জমা রয়েছে বলে কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর–ডিসেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদনও আলাদাভাবে প্রকাশ করেছে যমুনা অয়েল। তাতে দেখা যায়, উল্লিখিত প্রান্তিকে কোম্পানিটির সুদ বাবদ আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। আলোচ্য অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে এই খাত থেকে কোম্পানিটি আয় করেছে ৯৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২২০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে কোম্পানিটির সুদ আয় ১২৩ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৬ শতাংশ কমেছে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমীর মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন,একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমাদের কিছু আমানতের সুদ স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সুদবাবদ আয় কমে যাওয়ায় মুনাফা কমেছে।