বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ভবন
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ভবন

একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল বিএসইসি

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ১৭ কর্মকর্তাকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচ কর্মকর্তার বেতন সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। বিএসইসি প্রতিষ্ঠার পর একসঙ্গে এত কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর এটাই প্রথম ঘটনা।

জানা যায়, গত বছরের ৫ মার্চ বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও অন্য কমিশনারদের কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে নাজেহালের ঘটনায় মোট ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি। এর মধ্যে ১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে এবং ৫ জনের বেতন সর্বনিম্ন স্তর বা গ্রেডে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল মঙ্গলবার বিএসইসি এই সিদ্ধান্ত নেয়। আর আজ বুধবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চিঠি বিতরণ করা হয়।

জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো এবং ৫ কর্মকর্তার বেতন সর্বনিম্ন গ্রেডে অবনমনের কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।

বিএসইসি যে ১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে তাঁরা হলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসান ও মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মজুমদার, অতিরিক্ত পরিচালক মোল্যা মো. সিরাজ উস সুন্নাহ ও মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, যুগ্ম পরিচালক মোহা. রশীদুল আলম, উপপরিচালক মো. নানু ভুঞা, কাজী মো. আল ইসলাম, মো. সহিদুল ইসলাম, বনি ইয়ামিন খান ও তৌহিদ হাসান, সহকারী পরিচালক মো. আমিনুল হক খান, মো. আবদুল বাতেন ও মো. সাজ্জাদ হোসেন, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. আবু ইসুফ, কাওসার পাশা বৃষ্টি ও সমীর ঘোষ। আর যে পাঁচ কর্মকর্তার বেতন সর্বনিম্ন স্তরে অবনমন করা হয়েছে তাঁরা হলেন সহকারী পরিচালক মো. জনি হোসেন, মো. রায়হান কবির, মো. তরিকুল ইসলাম ও মাকসুদা মিলা এবং লাইব্রেরিয়ান মো. সেলিম রেজা বাপ্পী।

বিএসইসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিশনের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। তাই ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি কেন ওই ঘটনা ঘটেছিল, তার সঠিক কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি ছিল। এতে যদি তৎকালীন কমিশনের কোনো ধরনের ব্যর্থতা ও দুর্বলতা থেকে থাকে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল। সেটা কতটা হয়েছে এ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন সংস্থাটির নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক একাধিক চেয়ারম্যান। তাঁরা বলেন, এ ধরনের ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসিকে নিয়ে যেমন জনমনে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে, তেমনি বিদ্যমান কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের মনোবলও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

কী ঘটেছিল গত বছরের ৫ মার্চ

গত বছরের ৫ মার্চ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনারকে চার ঘণ্টার বেশি অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে সেনাবাহিনী এসে তাঁদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন। বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রতিবাদে ওই ঘটনা ঘটে। পরে তাঁরা তাঁদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও তৎকালীন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। এমনকি এ ঘটনায় কর্মবিরতিও পালন করেন আন্দোলনকারীরা। এ নিয়ে কয়েক দিন সংস্থাটিতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

এ ঘটনায় ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত বছরের ৬ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়। বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে ওই মামলা করেছিলেন। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি এ ঘটনায় সরকারি বিধি অনুযায়ী তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা রুজু হয়। নানা প্রক্রিয়া শেষে তদন্ত কমিটি ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই ২৩ কর্মকর্তার মধ্যে ২২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি। অন্য কর্মকর্তা আগেই আরেক অভিযোগে বরখাস্ত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিএসইসি চেয়ারম্যান (সাবেক) খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে এবং কমিশনার (সাবেক) মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখের উপস্থিতিতে কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে সভা চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাসহ আরও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশনের সভাকক্ষে জোরপূর্বক ও অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন। এরই মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কমিশনের মূল ফটকে তালা দেন, সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই, কমিশনের লিফট বন্ধ করে দেন এবং বিদ্যুৎ–সংযোগ বন্ধ করে মারাত্মক অরাজকতা ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাবেক কমিশনের সঙ্গে যে ঘটনাটি ঘটেছিল সেটি নিঃসন্দেহে বড় অপরাধ। সরকারি কর্মচারী হিসেবে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই অপরাধের শাস্তি পেয়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। তবে কেন ঘটনাটি ঘটেছিল, তাতে কারও ব্যর্থতা ছিল কি না, সেটি আমার জানা নেই। সেটি জানা গেলে ভালো হতো। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিএসইসি সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁদের আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’