
সম্প্রতি সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এর আগে বেড়েছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে প্রথম আলো কথা বলছে বিভিন্ন শিল্পঘন এলাকার ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে। আজ রয়েছে টাঙ্গাইল চেম্বারের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার তারিকুল ইসলামের সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক কামনাশীষ শেখর।
প্রথম আলো: সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলো। বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই পুরো দেশে বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সংকট চলছে। আপনার এলাকায় এ সংকট কতটা প্রকট?
খন্দকার তারিকুল ইসলাম: দেশের অন্যান্য স্থানের মতো টাঙ্গাইলেও গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। তবে এখানে বিদ্যুতের চেয়ে গ্যাসের সংকট অনেক বেশি। এ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের সংকট এতটাই প্রকট যে বাসা বাড়িতে রান্না করতেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
প্রথম আলো: সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, গ্যাসের দামও বেড়েছে বেশ অনেকটা। এই মূল্যবৃদ্ধি টাঙ্গাইল অঞ্চলের শিল্পে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?
খন্দকার তারিকুল ইসলাম: দেখুন, গ্যাস আর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে স্বাভাবিকভাবেই। তাই উৎপাদিত পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পাবে। এতে পণ্যের চাহিদা কমতে পারে, যা ব্যবসা ও শিল্পের খারাপ বার্তা বয়ে আনবে।
প্রথম আলো: আপনার এলাকার কোন ধরনের শিল্প ও ব্যবসার ক্ষতি বেশি হবে বলে আপনার ধারণা?
খন্দকার তারিকুল ইসলাম: টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী দুটি শিল্প ও ব্যবসা হচ্ছে তাঁতের শাড়ি ও মিষ্টি। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় চমচমের কথা। টাঙ্গাইলে ৩০ হাজারের ওপরে তাঁত রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে তিন শতাধিক মিষ্টি কারখানা। গ্যাসের সংকটের কারণে মিষ্টি শিল্প সংকটের মধ্যে পড়েছে। মিষ্টি তৈরিতে গ্যাসের ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কাঠের লাকড়ি পোড়াতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অপর দিকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে তাঁতশিল্পের ওপর। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রতিটা শিল্প ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রথম আলো: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকেরা বলছেন, গ্যাসের দাম যতটা বেড়েছে, তাতে করে টিকে থাকতে হলে তাদের হয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে হবে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। তেমন কোনো আশঙ্কা কি আপনি করেন?
খন্দকার তারিকুল ইসলাম: যে হারে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তাতে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়াতেই হবে। মূল্যবৃদ্ধি হলে পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। এ অবস্থায় টিকে থাকতে গিয়ে মালিকেরা ব্যয় কমানোর দিকে জোর দেবেন। উৎপাদনও কমে যাবে। তাই স্বাভাবিকভাবে কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়টি সামনে এসে যায়। এ অবস্থায় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মী ছাঁটাই হবে, এটাই স্বাভাবিক।
প্রথম আলো: বিদ্যুৎ আর গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে দাম বেড়েছিল জ্বালানি তেলের। এসব মূল্যবৃদ্ধি হলো এমন সময়, যখন শিল্পের মালিকেরা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। এর বাইরে রয়েছে ডলার-সংকট, ব্যাংক সমস্যা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে বলে আপনারা মনে করছেন?
খন্দকার তারিকুল ইসলাম: করোনা মহামারির সময় থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো, ডলার-সংকট—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা আরও জটিল সময়ের মধ্যে পড়েছেন। সামনে আরও কঠিন সংকট আসছে বলে মনে হচ্ছে।
প্রথম আলো: বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে ব্যবসার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, সেই ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসতে আপনারা নিজেরা কী করতে পারেন? আর এ ক্ষেত্রে সরকারের কী করার আছে? কী প্রত্যাশা আপনার?
খন্দকার তারিকুল ইসলাম: চলমান সংকট থেকে তৈরি হওয়া ক্ষতি থেকে বের হয়ে আসতে প্রত্যেক ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিককে ব্যয় সংকোচন করতে হবে। টিকে থাকার জন্য ব্যবসার গতানুগতিক দিকে না থেকে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। সরকারকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমাতে হবে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিয়ে, সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে টিকে থাকতে সহায়তা করতে হবে সরকারকে।