মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি

ট্রাম্পের নতুন শুল্কহার, বাংলাদেশের কী হবে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করেছে ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার ১৯ শতাংশ। দুই সপ্তাহ পার না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা গত শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ব্যাপক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বিকল্প পথও বেছে নিয়েছেন। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দেন তিনি। আর শনিবার তা আরও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাতিল হয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদিও কেউ এ নিয়ে স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না। আবার ১০ শতাংশের বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা–ও কেউ নিশ্চিত নন। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্কহারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে।

চুক্তি নিয়ে আগেই প্রশ্ন ছিল

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন নিয়ে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচনের তিন দিন আগে এ চুক্তি না করার পক্ষে তাঁরা মত দিয়েছিলেন। নির্বাচিত সরকারই এটা করুক—এটা ছিল সবার চাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি অংশ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল।

চুক্তি শেষে ১০ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এ চুক্তির বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা ওই দিন আরও বলেছিলেন, দুটি বড় অর্জন হয়েছে। পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৯ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে পোশাক পণ্য রপ্তানি করলে পাল্টা শুল্কহার হবে শূন্য। তবে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি মনে করে এই চুক্তি দেশের স্বার্থের অনুকূল নয়, তাহলে তারা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

সদ্য বিদায়ী বাণিজ্য উপদেষ্টা ও নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। তবে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিটি হয়তো বাতিল হয়ে যাবে। বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। ২৪ ফেব্রুয়ারির পর বোঝা যাবে, কী হতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা আগের পরিস্থিতির মতোই থাকবে বলে ধারণা করছেন রপ্তানিকারকেরা।

চুক্তি করতে এত তাড়াহুড়া করা হলো কেন, নির্বাচিত সরকারই তো করতে পারত, এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যসচিব বলেন, ‘এটা তখন স্বাক্ষর করা লাগত। আর এতে আমাদের উদ্দেশ্যমূলক কিছু ছিল না। যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁরা তা না পড়েই করছেন। অনেকের হয়তো পড়ার যোগ্যতাও নেই।’

বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে

গত শুক্রবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ), ১৯৭৭ প্রয়োগ করে পাল্টা শুল্ক (গত বছর ২ এপ্রিল) আরোপ করেছিলেন। কিন্তু এ আইন প্রেসিডেন্টকে পাল্টা শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।

দুই দেশের সংসদে অনুসমর্থনের বাধ্যবাধকতা থাকায় ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি। পুরো বিষয়টি নতুন করে দেখার সুযোগ আছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনই এ বিষয়ে কোনো অবস্থান নিয়ে ফেলা সমীচীন হবে না।
মোস্তফা আবিদ খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য

পরে ওই দিনই ট্রাম্প সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এর পরদিন শনিবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেন, শুল্ক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আদালতের ‘চরম আমেরিকাবিরোধী সিদ্ধান্তটি’ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর তাঁর প্রশাসন আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, শুল্কের এই হার ‘পুরোপুরি আইনসম্মত এবং আইনিভাবে পরীক্ষিত ১৫ শতাংশ স্তরে’ উন্নীত করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউস শুক্রবারই জানিয়েছে, নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা আগের পরিস্থিতির মতোই থাকবে বলে ধারণা করছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে বেশিবার শুল্কহার পরিবর্তন—একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে বলে মনে করেন রপ্তানিকারকেরা।

বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার না শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে। তবে ৯ ফেব্রুয়ারি হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেলে ভালো। বাতিল না হলে এটা নিয়ে নতুন করে ভাবার আছে। কারণ, এ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থহানির বহু ধারা আছে।’

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তিন মাসের জন্য সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে দেশটি এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে এবং ৮ জুলাই বাংলাদেশের জন্য হার ২ শতাংশ কমিয়ে করে ৩৫ শতাংশ। ওই বছরের ২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সমঝোতায় পৌঁছায় ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কে। এই ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাপক পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ, যা চুক্তিতেও আছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, দুই দেশের সংসদে অনুসমর্থনের বাধ্যবাধকতা থাকায় ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি। পুরো বিষয়টি নতুন করে দেখার সুযোগ আছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আরও কৌশলী হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনই এ বিষয়ে কোনো অবস্থান নিয়ে ফেলা সমীচীন হবে না।