চীনে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে। জেপি মরগানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় চীনের তেলের চাহিদা ৯ শতাংশ কমে গেছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি উদ্বেগজনক খবর।
তুলনা করলে দেখা যায়, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মহামন্দার সময় বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা কমেছিল মাত্র ২ শতাংশ। সেই তুলনায় চীনে চাহিদা কমে যাওয়ার যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা উল্লেখযোগ্য। সাধারণত অর্থনীতির গতি কমে গেলে তেলের চাহিদা কমে, কিন্তু চীনে তেলের চাহিদা কমলেও অর্থনীতি ধসের মুখে নয়।
চলমান তেলসংকট বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানিসংকটগুলোর একটি। সেই সঙ্গে চীন নিজেদের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ তেল আমদানি করে থাকে। এখানেই শেষ নয়, চীন ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এত কিছুর পরও চীনের তেল সরবরাহ পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে বেশ স্বাভাবিক।
বিষয়টি মোটেও এ রকম নয় যে সরকারি নির্দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ের অভিযান চালানো হয়েছে এবং তার ফলে তেলের চাহিদা কমেছে; বরং এর কারণ হলো, ভোক্তাদের আচরণ দ্রুত বদলে যাওয়া। চীনের মানুষ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ও গণপরিবহনের দিকে ঝুঁকেছে। দূরপাল্লার বিদেশভ্রমণের পরিবর্তে বেছে নিচ্ছে কাছাকাছি গন্তব্য।
শুধু চীন নয়, বিশ্বের অনেক জায়গাতেই এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব পরিবর্তনের কিছু ইতিমধ্যে তেলের চাহিদায় স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এমনকি হরমুজ প্রণালি আবার খুলে গেলেও সেই পরিবর্তনের ধারা পুরোপুরি উল্টে যাবে না।
অর্থাৎ বিশ্ব হয়তো ‘পিক অয়েলের’ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যে অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা কমতে শুরু করেছে এবং চাহিদা কখনোই আগের পর্যায়ে ফিরবে না।
চীনের পরিবর্তনের পেছনে কী
প্রতিবেশী অনেক দেশের মতো তেলসংকট বা রেশনিংয়ের মুখে পড়েনি চীন। এর একটি বড় কারণ হলো, যুদ্ধ শুরুর আগেই তারা তেলের বিশাল কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছে।
তবে এটি সাময়িক সমাধান। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের ভোক্তারা ক্রমবর্ধমান জ্বালানি মূল্যের বাস্তবতায় বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁরা দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) দিকে ঝুঁকছেন।
চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ দিনের মে দিবসের ছুটির শুরুতে দেশটির মহাসড়কগুলোতে ইভি চার্জিংয়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। পুরো ছুটির সময় মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়ির প্রায় এক-চতুর্থাংশই ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি, এক বছর আগের তুলনায় যা ৩৩ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে বিমানভ্রমণ ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ কমে যাওয়া। এর বিপরীতে আঞ্চলিক পথে বিমান পরিবহন বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। রেলপথে যাত্রী পরিবহন বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
ইউরোপেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জেপি মরগানের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নতুন গাড়ি নিবন্ধন সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার বড় অংশই ছিল হাইব্রিড গাড়ি। গত এক দশকে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতে বিপুল বিনিয়োগের ফলে বিদ্যুতের দাম কমে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ি আরও সাশ্রয়ী হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে চিত্র ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট রিপাবলিকানরা বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার সরকারি প্রণোদনা বাতিল করায় ইভির বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
জেপি মরগানের পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভার মতে, বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির কিছু খাতে তেলের ব্যবহার স্থায়ীভাবে কমে গেলে সামগ্রিক চাহিদায় এমন প্রভাব পড়তে পারে, যেখান থেকে আর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।
নাতাশার ভাষায়, ইতিহাস বলে, অতীতের তেলসংকটের সময় পেট্রলের চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী পতন হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই।
১৯৭৩ সালের শিক্ষা
এর আগে ১৯৭৩ সালে বিশ্ব বড় ধরনের তেলসংকটের মুখে পড়েছিল। সেই সংকটের কারণে যে শুধু জ্বালানিবাজারে প্রভাব পড়ে, তা নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের কাঠামোতেও স্থায়ী পরিবর্তন আসে।
ওই সংকটের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গঠিত হয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়। দ্রুত বাড়তে থাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা, সম্প্রসারিত হয় গণপরিবহন। যানবাহন ও ভবনের জ্বালানিদক্ষতা বাড়াতে নতুন মানদণ্ড চালু করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি বিভাগ গঠিত হয়; জাতীয় মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৫৫ মাইলে নামিয়ে আনা হয়। ১৯৭০-এর দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি কমে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেসন বর্ডফ বলেন, ১৯৭৩ সালের তেলসংকট ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা। এই সংকটের জেরে নীতিনির্ধারকেরা তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অন্যান্য সংকটের সময়ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এসেছে। যেমন করোনা মহামারির পর দূর থেকে কাজ করা বা টেলিকমিউটিং ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পায়, নিয়মিত অফিস যাতায়াতের প্রয়োজন কমে যায়।
একইভাবে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করে।
চাহিদা কতটা কমতে পারে
ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মার্চে দৈনিক চাহিদা কমেছে ২৮ লাখ ব্যারেল, এপ্রিলে কমেছে ৪৩ লাখ ব্যারেল, মে মাসে ৫৬ লাখ ব্যারেল।
তবে করোনা মহামারির সময় দৈনিক চাহিদা প্রায় এক কোটি ব্যারেল কমে গিয়েছিল, সেই বাস্তবতা এখনো আসেনি, তবে পরিস্থিতি সেই দিকে এগোচ্ছে। এই চাহিদার একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধার হবে, তবে পুরোটাই যে ফিরে আসবে, তা নয়।
আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ প্রান্তে দৈনিক গড়ে ৪ লাখ ১৮ হাজার ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির চাহিদা কমে যাবে। অন্য কথায়, বাজার থেকে এই পরিমাণ তেলের চাহিদা হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাওয়া দৈনিক ১ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল পেট্রলের চাহিদার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ আর কখনোই ফিরে আসবে না বলে মনে করছে জেপি মরগান।
নাতাশা কানেভার ভাষায়, ভোক্তারা একবার বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়লে সেই পরিবর্তন স্থায়ী হবে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি কবে খুলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বিষয়টি হলো, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যেসব পরিবর্তন এসেছে, হরমুজ যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, সেই পরিবর্তনের তত বেশি অংশ স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আরএসএম ইউএসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস বলেন, ‘অতীতের সরবরাহ-সংকট ও যুদ্ধের কারণে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমন কিছু শিক্ষা পেয়েছে, যে শিক্ষার কথা তারা সহজে ভুলবে না। আমরা এখন বাস্তব সময়েই সেই সমন্বয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’
তবু কেন বাড়তে পারে তেলের চাহিদা
তবে তেলের ওপর নির্ভরতার গুরুত্ব খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—সবখানেই অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজন আছে। ফলে তেল এত দ্রুত অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে না।
উড ম্যাকেঞ্জির পরিশোধন, রাসায়নিক ও তেলবাজার গবেষণা বিভাগের প্রধান অ্যালান গেল্ডারের মতে, স্বল্প মেয়াদে তেলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনমনীয়। হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে তেলনির্ভর যন্ত্রপাতির আগের মতোই জ্বালানি প্রয়োজন হবে; সেই জ্বালানি হবে জীবাশ্ম জ্বালানি।
এ ছাড়া প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পর অনেক দেশ তাদের কৌশলগত তেল মজুত পুনর্গঠন করতে চাইবে। পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিংয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সাল পর্যন্ত এ কারণে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হতে পারে।
তবে ভোক্তাদের আচরণে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব তেলবাজারের তথ্য-উপাত্তে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে আরও কয়েক বছর সময় হয়তো লেগে যাবে।
স্থায়ী পরিবর্তন মানে স্থায়ী পরিবর্তনই। মানুষ প্রকৃত অর্থেই অভ্যাস বদলে ফেললে শেষমেশ সেই পরিবর্তনের ছাপ অর্থনীতিতেও পড়বে।