ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর আজ সোমবার নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে এটাই ‘এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান’।
জবাবে ইরান বলেছে, ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চলতে থাকলে পারস্য উপসাগর থেকে সব তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেবে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আজ সোমবার ওয়াশিংটন সময় বেলা ১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা) সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে আছে ইরান।
গতকাল রোববার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট লিখেছেন, ‘ভোরে শুরু হবে অর্থনৈতিক ডি-ডে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, সেই দিনটি ইতিহাসে ‘ডি-ডে’ নামে পরিচিত) এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান।’
এদিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে সরাসরি সামরিক হামলা থেকে বিরত আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে সমাধান হয়নি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত মানুষের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের। হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
তবে ইরানের হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যথেষ্ট মজুত আছে। এসব অস্ত্র দিয়ে তারা উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধের হুমকি দিতে পারে। ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি ধরে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায়।
নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বিস্তারিত না জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী বলেন, ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে। তাঁর ভাষায়, এই দেশগুলো ‘ভীত’। তিনি আরও বলেন, এসব দেশ ইরান ‘তোষণ’ নীতি গ্রহণ করেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে স্কট বেসেন্ট লিখেছেন, ইরানের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার পরিণতি কী হতে পারে, তা এসব দেশের বিবেচনা করা উচিত।
পাল্টা ব্যবস্থার ইঙ্গিত ইরানের
নতুন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা একের পর এক কঠোর বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই গতকাল পাল্টা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মোহসেন রেজাই বলেন, ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না—হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথেও নয়।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা সমর্থনকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে ইরান।
এর আগে স্কট বেসেন্ট চীনকে আহ্বান জানান, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে চীন আমদানি করা তেলের প্রায় অর্ধেক উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে থাকে। জবাবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধান দেবে না।’ তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপে ছিল। হামলায় দেশটির অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে তেহরান প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান ধরে রাখলেও ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এতে আবার বিক্ষোভ শুরু হতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ইরানের অর্থনীতি নানা সমস্যায় জর্জরিত। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, জ্বালানিসংকট, নিষেধাজ্ঞা ও নানা কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকট। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবকাঠামোজনিত ক্ষতি, বাণিজ্য বাধা, উৎপাদন কমে যাওয়া ও পুনর্গঠনের বাড়তি ব্যয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ সরাসরি আলোচনা হয়েছিল গত জুন মাসে, সুইজারল্যান্ডে। এরপর কাতার, পাকিস্তান, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরান জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির আজ তেহরান সফর করবেন। এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তাঁর এই সফর। তবে সফর নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
যুদ্ধের সময় ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ১৮ জন সেনা নিহত ও ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।