জ্বালানি তেল
জ্বালানি তেল

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়াল

বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ইরানের সাউথ পার্স-এ বিমান হামলার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৮২.৭৮ পাউন্ড) ছাড়িয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে পৌঁছায়, যা মঙ্গলবারের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। পরে অবশ্য দাম কিছুটা কমেছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের গ্যাসের বেঞ্চমার্ক মূল্যও ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি থার্ম ১৪৩ দশমিক ৫৩ পেন্সে ওঠে, যা পরে ১৪০ পেন্সে নেমে আসে। উল্লেখ, ‘থার্ম’ গ্যাসের শক্তি পরিমাপের একটি একক; ১ থার্ম সমান ১ লাখ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ)। অন্যদিকে ‘পেন্স’ হচ্ছে ব্রিটিশ মুদ্রার ক্ষুদ্র একক। ১৪৩ দশমিক ৫৩ পেন্স ১ দশমিক ৪৪ পাউন্ডের সমান।

ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ১৮ মার্চ ভোরে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এই খবরের পরই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এ ছাড়া সাউথ পার্সে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর কাতার জানায়, ইরানের হামলার পর কাতারের রাস লাফান শিল্প এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যেখানে কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র অবস্থিত। উল্লেখ্য, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রটির অংশীদার ইরানের পাশাপাশি কাতারও। মূলত গ্যাসক্ষেত্রটি দুই ভাগে বিভক্ত। ইরানের অংশটি সাউথ পার্স আর কাতারের অংশটি নর্থ ডোম নামে পরিচিত।

এদিকে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লেও এখনো তা যুদ্ধ শুরুর সময়ের সর্বোচ্চ স্তরের নিচেই রয়েছে। ৯ মার্চ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ দশমিক ৭৮ ডলারে পৌঁছেছিল। তার আগে ৩ মার্চ যুক্তরাজ্যের গ্যাসের দাম ছিল প্রতি থার্ম ১৬২.৫৫ পেন্স।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড-ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাতে দেশটির তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার জবাবে তারা ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে। তাসনিমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা বলে, ‘আমাদের দেশের জ্বালানি, গ্যাস ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর হামলা হলে শক্তিশালী পাল্টা আঘাতের পাশাপাশি সেই আক্রমণের উৎসেও কঠোর হামলা চালানো হবে।’ তারা আরও জানায়, আক্রমণের উৎস দেশগুলোর জ্বালানি ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হবে। এবং দ্রুত প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

কাতার বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকারী দেশ। যুদ্ধের কারণে মার্চের শুরুতেই উৎপাদন বন্ধ করে দেয় দেশটির কর্তৃপক্ষ। গ্যাসক্ষেত্র নর্থ ডোমে হামলার পর গতকাল বুধবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

অন্যদিকে কাতারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘ইরানের হামলার পর রাস লাফান এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।’ পরে কাতার এনার্জি জানায়, সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে আগুন প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কোনো হতাহতের খবর নেই।

বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে

বেসরকারি সংস্থা এজে বেলের প্রধান আর্থিক বিশ্লেষক ড্যানি হিউসন বলেন, ইরানের হামলা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। তেলের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা খুব কম। এই পরিস্থিতি না বদলানো পর্যন্ত জ্বালানির বাজার অস্থিরই থাকবে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস ১৯২০ সালের ‘জোন্স অ্যাক্ট’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এই আইনে কেবল মার্কিন নির্মিত জাহাজ দিয়ে দেশীয় বন্দরগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনের অনুমতি ছিল।

মার্কিন প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ৬০ দিনের জন্য এই শিথিলতা জ্বালানি, গ্যাস, সার ও কয়লার মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সহজে পরিবহনের সুযোগ তৈরি করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌপরিবহন খাতের সংগঠনগুলো বলছে, এর প্রভাব সীমিত হবে। কারণ, জ্বালানির খুচরা দামের মূল কারণ পরিবহন ব্যয় নয়, বরং বৈশ্বিক তেলের দাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিশ্বনেতাদের আগের পদক্ষেপ—যেমন কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়, তেমন কার্যকর হয়নি।

এদিকে ইরান নিজস্ব সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইরাকে গ্যাস রপ্তানি স্থগিত করেছে বলে রয়টার্সকে এক ইরাকি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। গ্যাস এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৯৪ শতাংশ দেশীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়।