যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এড়াতে চীনকে সহায়তা করেছে ৪০টির বেশি দেশ। এসব দেশের মাধ্যমে চীনা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। লক্ষ্য ছিল, তুলনামূলক কম হারে আমদানি শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রি করা। হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
যেসব দেশ চীনকে সহায়তা করেছে, সেই তালিকায় কানাডা, ভারত, মেক্সিকো, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ আছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, এসব দেশের মাধ্যমে চীন কয়েক হাজার কোটি ডলারের মার্কিন শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, এর ফলে যেমন ‘মার্কিন কর্মসংস্থানে’ প্রভাব পড়েছে, তেমনি হাজার হাজার কোটি ডলারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের বিরোধিতা করেন।
তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো নিয়ে কোনো একতরফা পদক্ষেপ বা চুক্তি যেন অন্য দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন ওই মুখপাত্র।
এদিকে বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত আছে। এর মধ্যে কয়েক সপ্তাহ পর ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করার কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ৩০ বিলিয়ন বা ৩ হাজার কোটি ডলার থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য বেশি শুল্কের আওতাভুক্ত দেশ থেকে কম শুল্কের আওতাভুক্ত দেশের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।
এই প্রক্রিয়া ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ নামে পরিচিত। এর অর্থ হলো, পণ্য চূড়ান্ত গন্তব্যে যাওয়ার পথে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পাঠানো। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীন কম শুল্কের আওতাভুক্ত দেশগুলোকে ব্যবহার করে এই পদ্ধতির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দাবি, চীন তৃতীয় দেশকে মধ্যবর্তী গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করেছে। সেই সঙ্গে পণ্যের মোড়ক পরিবর্তন করে প্রকৃত উৎপত্তিস্থল আড়াল করেছে। ফলে এসব পণ্য কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকেছে। প্রতিবেদনে এ প্রক্রিয়াকে ‘কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রতারণা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনের শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক চ্যাং পাও লির মতে, এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য আলোচনায় ওয়াশিংটনের দর-কষাকষির অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
লি বিবিসিকে বলেন, চীন তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ ধরে রেখেছে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুক্তি দিতে পারে। ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্য চুক্তি হলে সরাসরি চীনা রপ্তানির পাশাপাশি তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে চ্যাং বলেন, বাণিজ্যপ্রবাহের এই পরিবর্তনের কিছু অংশ বৈধও হতে পারে। উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া বা সরবরাহব্যবস্থার পুনর্গঠনের কারণে এমন পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে চীনের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যেসব দেশ গভীরভাবে যুক্ত, সেই দেশগুলো ঝুঁকি ও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশের আলোচনার পর বেশির ভাগ শুল্ক আরোপ স্থগিত করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ অব্যাহত আছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র চীনের মানবাকৃতির রোবটের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তার জেরে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ড্রোন রপ্তানিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ১৫৭টি দেশের পণ্যে পাইকারি হারে শুল্ক আরোপ করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এই শুল্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যেমন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব, তেমনি অর্থনীতিও শক্তিশালী করা সম্ভব। পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্কের বিরুদ্ধে রায় দিলেও বিকল্প আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপ অব্যাহত রেখেছেন ট্রাম্প।