জব্দ হওয়া সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এর মাধ্যমে ইরানের ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের তহবিল ছাড়ের পথ তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, আগামী ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির সুযোগ দিতে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। তারা বলেছে, সুইজারল্যান্ডে টানা ১৮ ঘণ্টার আলোচনার ফল হিসেবে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শক দলকে পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইরান—এমন কথাও বলা হয়েছে। খবর আল–জাজিরা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ছাড় হওয়া অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কিনতে হবে। তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ মন্তব্য নাকচ করেছে। তাদের ভাষ্য, তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা নেই।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বৃহত্তর সমঝোতা স্মারকের তাৎক্ষণিক ফল হিসেবেই জব্দ থাকা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের তহবিল ছাড়ের সিদ্ধান্ত এসেছে।
গালিবাফের ভাষ্য, ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের তহবিল ৬০০ কোটি ডলারের দুটি কিস্তিতে ছাড় হবে। এই অর্থ ছাড় করানোই তেহরানের জন্য অন্যতম বড় সাফল্য। গতকাল সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই অর্থছাড়ের চুক্তি সুইজারল্যান্ডেই চূড়ান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকিং, বিমা ও পরিবহন খাতেও ছাড় আসবে বলে জানান তিনি।
এ সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও স্বাভাবিক হবে—এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই খুশি। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক হেনরি এনশার বলেছেন, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল আবার শুরু হওয়া—এ দুই বিষয় থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছে।
হেনরি এনশার আল–জাজিরাকে বলেন, দুই পক্ষই এমন বার্তা দিতে চাইছে যে আলোচনায় তারা পিছিয়ে নেই; বরং তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পেরেছে। অন্তত তারা এমন অবস্থায় নেই যে প্রতিপক্ষ তাদের সুযোগ নিতে পেরেছে।
এনশার বলেন, বাস্তবে যখন অর্থের প্রবাহ শুরু হবে, তখনই বোঝা যাবে, ঘটনা প্রকৃত অর্থেই ঘটছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার জাহাজ চলাচল করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে তেলবাহী জাহাজও রয়েছে।
এনশার ভাষায়, এর অর্থ হচ্ছে অর্থের প্রবাহ শুরু হয়েছে এবং দুই পক্ষই নিজেদের চাওয়া অনুযায়ী কিছু না কিছু পেয়েছে—এটাই তাদের অর্জন।
১৯৭৯ সালে ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দখল করে মার্কিন কূটনীতিকদের জিম্মি করে। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্য দিয়ে ইরানের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়।
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। পরে ১৯৯৬ সালে মার্কিন কংগ্রেস ইরানের তেল খাতে বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইন পাস করে। তবে ইউরোপের বিরোধিতার কারণে আইনটি ২০১০ সাল পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ না করায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তীকালে পারমাণবিক কর্মসূচি–সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার পরিসর আরও বিস্তৃত করা হয়।
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর জবাবে তেহরান তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানি তেল আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলো জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন স্বাক্ষর করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের তেল ও ব্যাংকিং খাতে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
২০২৫ সালে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আওতা আরও বৃদ্ধি করেন। তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে—এমন তৃতীয় পক্ষও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসে। যেমন চীনের ছোট স্বাধীন তেল শোধনাগার এবং ইরানি তেল কেনা জাহাজ পরিবহন কোম্পানিগুলো।
ইরানের মোট কত সম্পদ এখনো জব্দ অবস্থায় আছে, তার কোনো নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই বলে বিবিসির সংবাদে বলা হয়েছে।
২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কয়েকটি দেশের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার বাস্তব আশা তৈরি হয়। সেই সময় থেকেই বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নানা ধরনের, এমনকি পরস্পরবিরোধী হিসাব সামনে আসে।
এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, ইরানের জব্দ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলার হতে পারে। পরে অবশ্য তিনি সেই হিসাব কমিয়ে ৫ হাজার কোটি থেকে ৬ হাজার কোটি ডলারে নামিয়ে আনেন।
একই বছরের আগস্টে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর জানান, সে সময় জব্দ সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
এর মধ্যে ২৩ বিলিয়ন ডলার ছিল জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। বাকি ৬০০ কোটি বিলিয়ন ডলার ছিল ভারতের কাছে, তেল বিক্রির রাজস্ব হিসেবে।
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির ফলে ইরান তাদের জব্দ থাকা সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল। তবে এর বড় অংশ ছিল বিশেষ হিসাবের মধ্যে আটকে। ফলে পুরো অর্থ হাতে পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশি দিন টেকেনি। ২০১৮ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে যান। তখন আবারও ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে কয়েক বছর আগে ইরান যে সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল, সেই সম্পদের বড় অংশ আবার জব্দ হয়ে যায়।