ইরান যুদ্ধের শুরুর কয়েক সপ্তাহে জেট ফুয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এতে বিমান সংস্থাগুলো বাড়তি খরচ যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেয়—ভাড়া বাড়িয়ে, ফ্লাইট কমিয়ে ও লাগেজ ফি বাড়িয়ে।
ডেলটা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী এড বাস্টিয়ান গত সপ্তাহে বলেন, ‘আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।’ তিনি জানান, শুধু এই প্রান্তিকেই ডেলটার মতো বড় বিমান সংস্থাগুলোকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রায় ২০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে।’
তবে গত দুই মাসে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করলেও বাড়তি ভাড়া বা ফি কমানোর পরিকল্পনা নেই বিমান সংস্থাগুলোর। বাস্টিয়ান বলেন, উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও বর্তমান ভাড়ার স্তর ‘ঠিক’ আছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাড়তি ভাড়ার পেছনে মূল কারণ বাড়তি চাহিদা। গ্রীষ্মকালীন ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুমে যাত্রীরা বাড়তি খরচ মেনেই ভ্রমণ করছেন। একই সঙ্গে বাজারে আসনের সংখ্যাও কমে গেছে।
তেলবিশ্লেষক টম ক্লোজা বলেন, যে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতার কারণে ভাড়া বেশি রয়েছে, সেই একই কারণেই জেট ফুয়েলের দাম কমেছে। বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ায় জেট ফুয়েলের চাহিদা কমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধনাগারগুলো বেশি দামে লাভ করতে গিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছে। এ দুই কারণে এপ্রিলের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত জেট ফুয়েলের স্পট মূল্য প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
অথচ বিমানভাড়া কমেনি। ডয়চে ব্যাংক সিকিউরিটিজের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় প্রায় সব ধরনের ভাড়া এখনো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। বসন্তের পর থেকে বিমান সংস্থাগুলো অন্তত আটবার ভাড়া বাড়িয়েছে; সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহ আগে।
ডয়চে ব্যাংকের বিমানবিশ্লেষক মাইক লিনেনবার্গ বলেন, ভাড়া বেশি থাকার কারণ হলো বিমানের আসনসংখ্যা কমে যাওয়া। বিমান সংস্থাগুলো কম জনপ্রিয় ও কম ভাড়ার ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে। মে মাসে স্পিরিট এয়ারলাইনসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিমান সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, টিকিটের দাম মূলত নির্ভর করে আসনের সরবরাহ ও যাত্রীদের চাহিদার ওপর, জ্বালানির দামের ওপর নয়। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী বব জর্ডান এপ্রিল মাসের আয়সংক্রান্ত এক আলোচনায় বলেন, ‘টিকিটের দাম ঠিক হবে বাজার পরিস্থিতির ওপর ভর করে, কোনো একাডেমিক সূত্র বা বাড়তি জ্বালানি খরচ বহনের হিসাবের ভিত্তিতে নয়।’
এর মানে এই নয় যে বছরের শুরুতে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর ব্যয় বাড়েনি। জেট ফুয়েলের এই শিল্পের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয় খাত। একক করিডরবিশিষ্ট বাণিজ্যিক বিমান প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ গ্যালন জ্বালানি পোড়ায়। দেশের তিন বড় বিমান সংস্থা—ডেলটা, আমেরিকান ও ইউনাইটেড—শুধু দ্বিতীয় প্রান্তিকেই অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার জ্বালানি ব্যয় করেছে।
তবে লিনেনবার্গ বলেন, বাড়তি ভাড়া থেকে বিমান সংস্থাগুলো সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের চেয়েও বেশি আয় করবে। বিশেষ করে ছোট বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বাড়তি নগদ প্রবাহ এখন জরুরি। তিনি আরও বলেন, ‘কোভিডের পর এখনো অনেক সংস্থার মুনাফা টেকসই হয়নি, বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না।’
সে কারণেই বিমান সংস্থাগুলো ভাড়া কমাতে তাড়াহুড়া করছে না। ইউনাইটেডের প্রধান বাণিজ্য কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু নোসেলা এপ্রিলে বিনিয়োগকারীদের বলেন, ‘যত বেশি সময় ভোক্তারা এই দামে টিকিট কিনবেন এবং বিমান সংস্থাগুলো এই আয়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হবে, তত বেশি এই উচ্চ ভাড়া স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শরৎকালে টিকিটের দাম কিছুটা কমতে পারে। গ্রীষ্মকালীন ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুম শেষে ভাড়া স্বাভাবিকভাবেই কমে যাওয়ার কারণে তা হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভাড়া বৃদ্ধির ধারা শেষ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী শরৎকালেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় একই হারে ভাড়া বেশি থাকতে পারে। সম্ভাবনা আছে, বছরজুড়েই টিকিটের আগাম সংরক্ষণের হার ভালো থাকবে।
এয়ারলাইন–বিষয়ক সংবাদপত্র ফ্রম দ্য ট্রে টেবিলের লেখক জ্যাক গ্রিফ বলেন, ‘এমন নয় যে আমরা আশা করতে পারি বিমানভাড়া হঠাৎ কমে যাবে। বাড়তি যত ধরনের মাশুল আছে, লাগেজ মাশুল তার মধ্যে সবচেয়ে স্থায়ী। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিমান সংস্থাগুলো সহজে ফিরিয়ে নেয় না।’
নিওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউনাইটেডের যাত্রীরা গত সপ্তাহে বলেন, বাড়তি ভাড়া নিয়ে তাঁরা খুশি নন, তবে বিস্মিতও নন।
বান মোরেল নামের এক যাত্রী বলেন, ‘সব সময়ই এমন হয়। সবকিছুর দাম বাড়ে, কিন্তু আর কমে না।’ তিনি পুয়ের্তো রিকো যাওয়ার জন্য ৪০০ ডলারের যাওয়া-আসার টিকিট কিনেছেন, এর বাইরে শুধু লাগেজের জন্য ১০০ ডলার গুনতে হয়েছে।
বান বলেন, বেশি ভাড়ার কারণে ভবিষ্যতে তাঁর ভ্রমণ কমবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি আরও বলেন, তবে নিশ্চিতভাবেই ছোট ব্যাগ নিয়ে ভ্রমণ করব।
৬৭ বছর বয়সী মাইকেল বোয়েনিশ ও তাঁর স্ত্রী ইউরোপ সফর শেষে ফিরছিলেন। লাগেজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তিনি বলেন, ‘দাম সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়, কিন্তু কমতে অনেক সময় লাগে। হয়তো এটাই মেনে নিতে হবে।’
তবে মাইকেল বলেন, এই টাকায় যে সেবা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর ভাষায়, ‘আমার জীবদ্দশায় বিমানযাত্রার মান সবচেয়ে খারাপ হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম, এত দিনে আটলান্টিক পাড়ি দিতে তিন ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু এখনো গাদাগাদি করে এমন আসনে বসতে হয়, যেখানে আমার চেয়ে বড় কেউ ঠিকমতো বসতেই পারবে না।’
তবু নিওয়ার্কের অনেক যাত্রী জানিয়েছেন, বাড়তি খরচ সত্ত্বেও এই গ্রীষ্মে তাঁরা ভ্রমণের পরিকল্পনা কাটছাঁট করছেন না।
শানে হ্যারিস স্বামী স্টেফন ও ছেলে ল্যাংস্টনকে নিয়ে ওয়াশিংটন থেকে ফিরছিলেন। এই গ্রীষ্মে তাঁদের পরিবার আরও তিনটি বিমানভ্রমণের পরিকল্পনা করেছে—আটলান্টা, ইন্ডিয়ানাপোলিস ও পর্তুগাল।
হ্যারিস আরও বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন কার্যক্রমের কারণেই আমাদের এখন বেশি বিমানভ্রমণ করতে হচ্ছে, বিষয়টি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’