তেল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশ, কার উৎপাদন কত

২০২৫ সালে বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশ বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের অর্ধেক জোগান দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও সৌদি আরব—এ তিন দেশ থেকেই এসেছে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ। এর অর্থ হলো, অল্প কয়েকটি দেশের হাতেই বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) থেকে এসব তথ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের বার্ষিক গড় উৎপাদনের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রণয়ন করেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে ঠিক, তবে অঞ্চল হিসেবে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদিত হয় মধ্যপ্রাচ্যে। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে—৩০ থেকে ৩২ শতাংশ। এ অঞ্চলের সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত—সব কটি দেশই বিশ্বের শীর্ষ ১০ তেল উৎপাদনকারীর তালিকায় আছে। তেল–বাণিজ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব কেন এতটা বেশি, এ পরিসংখ্যান থেকেই তা বোঝা যায়।

দেখা যাক, বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ কোনগুলো। দেশগুলো দৈনিক কত উৎপাদন করছে এবং বৈশ্বিক উৎপাদনে তার হিস্যা কত, সে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, উৎপাদন: ১৩.৫৮ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ১৬.০৮%

তেল উৎপাদনে এখন শীর্ষস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। গত এক দশকে শেল অয়েল বিপ্লবের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে যে রূপান্তর ঘটেছে, এ পরিসংখ্যানে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বিশেষ করে টেক্সাস ও নিউ মেক্সিকো অঞ্চলের পারমিয়ান বেসিন এখন দেশটির তেল উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যেমন হরাইজন্টাল ড্রিলিং ও হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং পদ্ধতির কারণে তাদের তেল উৎপাদন এতটা বেড়েছে। ফলে একসময় তেল আমদানিনির্ভর যুক্তরাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে প্রভাবশালী উৎপাদক ও রপ্তানিকারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

রাশিয়া, উৎপাদন: ৯.৮৭ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ১১.৬৯%

বিশ্বের তেল উৎপাদনে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন বা ৯০ লাখ ৮৭ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও লিজ কনডেনসেট উৎপাদন করছে। রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তেল উৎপাদিত হয়—সাইবেরিয়া, উরাল অঞ্চল ও আর্কটিক এলাকার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে এই তেল আসে। সোভিয়েত যুগ থেকেই গড়ে ওঠা অবকাঠামো এবং পরবর্তীকালে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের কারণে দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা স্থিতিশীল আছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া বিকল্প বাজারে, বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো দেশে, তেল রপ্তানি বাড়িয়ে উৎপাদন ও আয়ের প্রবাহ ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

সৌদি আরব, উৎপাদন: ৯.৫১ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ১১.২৬%

তেল উৎপাদনে সৌদি আরব ঐতিহ্যগতভাবে অন্যতম প্রধান শক্তি। সৌদি আরবের তেল খাত মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সৌদি আরামকোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বাজার মূলধনের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানি। দেশটির উৎপাদিত তেলের বড় অংশ আসে গাওয়ারের মতো বিশাল তেলক্ষেত্র থেকে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনশোর তেলক্ষেত্র। ওপেকের অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে সৌদি আরব বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে দেশটি প্রায়ই নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের দামের ওঠানামায় সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত বড় প্রভাব ফেলে।

কানাডা, উৎপাদন: ৪.৯৪ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ৫.৮৫%

বিশ্বের তেল উৎপাদনে কানাডার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে স্যান্ডি অয়েল উৎপাদনে। কানাডার তেলের মূল উৎস হলো আলবার্টা প্রদেশের তেল; এ তেল অনেক ভারী। এ তেল উত্তোলনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে জটিল। পরিবেশের ওপর তার প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। কেননা, এ তেল উৎপাদনে বেশি শক্তি ও পানি ব্যবহৃত হয়। কানাডার মূল বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি–বাণিজ্য বেশ শক্তিশালী। কানাডা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের উৎস হিসেবে স্থিতিশীল।

ইরাক, উৎপাদন: ৪.৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল/ দিন, হিস্যা: ৫.২০%

মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনে ইরাক দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির তেল উৎপাদন মূলত দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল তেলক্ষেত্র, বিশেষ করে বসরা অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ইরাক তেল উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওপেকের সদস্য হিসেবে ইরাক বৈশ্বিক তেলের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের রপ্তানি ও উৎপাদনের সিদ্ধান্ত শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্বজুড়ে তেলের মূল্য ও সরবরাহের ভারসাম্যও প্রভাবিত করে।

চীন, উৎপাদন: ৪.৩৪ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ৫.১৪%

তেলের চাহিদার দিক থেকে চীনের বিশ্বের শীর্ষ দেশ হলেও উৎপাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নয়। দেশটির তেল উৎপাদন মূলত উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলকেন্দ্রিক। সেখানে শেল অয়েল ও প্রথাগত—উভয় পদ্ধতিতেই তেল উত্তোলন হয়। চীনের নিজস্ব উৎপাদন থেকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কিছুটা পূরণ হলেও রপ্তানিকারক তারা উল্লেখযোগ্য নয়। তেলের বাজারে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব মূলত আমদানিভিত্তিক। চীনের অর্থনীতি গতি হারালে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা ও দাম কমে যায়—এটাই বাস্তবতা।

ইরান, উৎপাদন: ৪.১৯ মিলিয়ন/ব্যারেল, হিস্যা: ৪.৯৬%

ইরান মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনে অন্যতম প্রধান দেশ। ইরানের তেল মূলত পার্সিয়ান উপসাগরের তেলক্ষেত্র এবং দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য বড় তেলক্ষেত্র থেকে আসে। দেশটির তেল খাত প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রভাব পড়ছে। ওপেকের সদস্য হিসেবে ইরান বৈশ্বিক তেলের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে দেশটি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। সে কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, তেল–বাণিজ্যে তার কৌশলগত গুরুত্ব কতটা।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, উৎপাদন: ৩.৮২ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ৪.৫২%

সংযুক্ত আরব আমিরাত তেল উৎপাদনে স্থিতিশীল ও প্রভাবশালী। দেশটির তেল উৎপাদনের মূল কেন্দ্র আবুধাবি প্রদেশের বিশাল তেলক্ষেত্র। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেখানে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়। দেশের তেল খাত প্রায় সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি অ্যাডনকের নিয়ন্ত্রণে। উৎপাদন, রপ্তানি আন্তর্জাতিক চুক্তি—সবকিছুই তারা সমন্বিতভাবে পরিচালনা করে। উৎপাদনে স্থিতিশীলতা, ওপেকে নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ ও বড় ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি—এই তিনভাবে তারা উৎপাদনে প্রভাব বিস্তার করে। এভাবেই দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ এবং মূল্যের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কেবল উৎপাদক হিসেবে নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাজারের স্থিতিশীলতায়ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখেছে।

ব্রাজিল, উৎপাদন: ৩.৭৫ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ৪.৪৩%

ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার তেল উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ। ব্রাজিলের উৎপাদন মূলত দেশটির উপকূলবর্তী অফশোর তেলক্ষেত্র, বিশেষ করে প্রিসল্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত। এই প্রিসল্ট তেলক্ষেত্রগুলো গভীর সাগরে অবস্থিত; অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়া এই তেল উত্তোলন করা কঠিন। তা সত্ত্বেও পেট্রোব্রাস এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কোম্পানি সফলভাবে উৎপাদন পরিচালনা করছে। ব্রাজিলের তেল খাত অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে রপ্তানির ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে। প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে ব্রাজিল উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিচ্ছে।

কুয়েত, ২.৫৮ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন, হিস্যা: ৩.০৫%

কুয়েতের তেল উৎপাদন মূলত দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল তেলক্ষেত্র, বিশেষ করে বুরগান ও অন্যান্য বড় ক্ষেত্র থেকে আসে। বুরগান তেলক্ষেত্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনশোর তেলক্ষেত্রগুলোর মধ্যে একটি। দেশটির তেল খাত প্রায় সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রায়ত্ত কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (কেপিসি) নিয়ন্ত্রণে। ওপেকের সদস্য হিসেবে কুয়েত বৈশ্বিক তেল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কুয়েতের তেলক্ষেত্র সংখ্যায় কম হলেও কৌশলগত অবস্থান এবং আধুনিক অবকাঠামোর কারণে দেশটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।