জ্বালানি তেল
জ্বালানি তেল

বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়াল, হরমুজ অবরোধের হুমকির জের

আজ সোমবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা বেড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তেলের দাম যে বাড়বে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। কেবল ছিল বাজার খোলার অপেক্ষা।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় অচলাবস্থা ও হরমুজ প্রণালি অবরোধের পরিকল্পনার খবরে আজ বাজার খুলতেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশশিক ১৬ ডলারে ওঠে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০৪ দশমিক ৮২ ডলারে ওঠে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে আজ থেকে হরমুজ প্রণালিতে যে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন, বিশ্লেষকদের মতে, তা ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল। চলমান সংঘাতের মধ্যেও ইরান চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের অবরোধ দেওয়া হলে পরিস্থিতির আরও অবনিত হতে পারে, অর্থাৎ যুদ্ধ আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জ্বালানি খাতভিত্তিক হেজ ফান্ড গ্যালো পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মাইকেল আলফারো বলেন, হরমুজে অবরোধ থাকলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকবে। এই প্রণালি অবরোধের অর্থ হলো, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু আপাতত অনিশ্চয়তা বাড়বে। কোথায় কোথায় ঝুঁকি আছে, তার পুনর্মূল্যায়ন হবে। ফলে তেলের দাম আরও বাড়বে।

জ্বালানিবিষয়ক বহুজাতিক সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টসের পরিচালক অমৃতা সেন বলেন, অবরোধ কার্যকর হলে ইরানি তেল বাজারে ঢুকতে পারবে না। তাঁর ভাষায়, এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামপণ্য রপ্তানিতে কার্যত ছাড় দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করেছিল। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থেই অবরোধ হলে দৈনিক অতিরিক্ত ১৫ থেকে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে দৈনিক প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ স্থগিত আছে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যে আলোচনায় বসেছিল, সেখানে মূল বিরোধ ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি নিয়ে। তবে শনিবার চুক্তি ছাড়াই আলোচনা ভেঙে যায়। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের প্রায় এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল এখনো সরাসরি যুদ্ধে ফেরার ইঙ্গিত নয়, তবে বোঝা যাচ্ছে, উত্তেজনা বাড়বে। ফলে জেট ফুয়েল ও ডিজেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়ামপণ্যের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ক্লিয়ারভিউ এনার্জি পার্টনার্সের গবেষণাপ্রধান কেভিন বুক বলেন, সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব বাড়বে। ইরানি ট্যাংকার অবরোধ করা হলে তেলের দাম বাড়বে এবং সংকট আরও তীব্র হবে।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের কমোডিটি কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় বোঝা যায়, গ্রীষ্মকালীন উচ্চ চাহিদার সময়েও তিনি দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। অবরোধ হলে শুধু আশঙ্কা বাড়বে না, তেলের স্পট মার্কেট ও আগাম বাজার—দুই বাজারের দামও পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসতে পারে। তখন সরবরাহঝুঁকি বাস্তব হয়ে উঠবে।

এদিকে গত সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার বাজার কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি হবে—এমন আশায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ২০ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৯৬ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়ায়—২০২২ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক মূল্য পতন।

রিস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক জর্জে লেওন বলেন, তেলের দাম আবারও ১১০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে। কেননা, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দ্রুতই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক হোয়াইট হাউস জ্বালানি উপদেষ্টা বব ম্যাকনালি ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এখন মূল প্রশ্ন হলো, ইরান ও তার মিত্ররা এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর পাল্টা আঘাত হানবে কি না।