সোনা
সোনা

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার

যুদ্ধের মধ্যে সোনার দাম কেন বাড়ছে না

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ আজ বুধবার ১৯ তম দিনে গড়িয়েছে। তবে এমন অনিশ্চয়তার সময়েও সোনার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো, সোনার দাম না বেড়ে বরং প্রায় স্থির হয়ে আছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে প্রথম দফায় হামলা চালানোর পর থেকে এই যুদ্ধ কেবল ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেখা গেল, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়ে, সে নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) শীর্ষ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি ‘বন্ধ’ করে দেওয়া হয়েছে। এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে গত দুই সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে চাপ দেখা গেছে। কিন্তু একই সময়ে সোনার দাম সেভাবে বাড়েনি। বিষয়টি বিশ্লেষকদের নজর এসেছে।

সোনার দামে কী হচ্ছে

বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।

অর্থাৎ সোনার দাম এমনিতেই বেশি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, চলতি বছর সোনার দাম ছয় হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

আজ বুধবার সকালে এই প্রতিবেদন লেখার সময় নিউইয়র্কের স্পট মার্কেটে সোনার দাম ছিল আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৯৯১ ডলার। আজ দাম কমেছে ১০ ডলারের মতো। স্পট মার্কেটের দাম হচ্ছে তাৎক্ষণিক দাম অর্থাৎ এই মুহূর্তে কেউ বিশ্ববাজার থেকে সোনা কিনতে চাইলে যে দামে কিনতে হবে, সেই দাম। অন্যদিকে এপ্রিলে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্সের দাম ৪ হাজার ৯৯৮ ডলারে উঠেছে।

সাধারণত অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সোনার দিকে ঝোঁকেন। ফলে সোনার মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাপী সংঘাতের সময় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর সোনার দাম দ্রুত বেড়ে যায়। প্যারিসভিত্তিক ফরাসি আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ রেমি বুরজো বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এতে সোনার বাজারের গতিপথই বদলে যায়।

চীনসহ কয়েকটি দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্যাপকহারে সোনা কেনা শুরু করে। এতে সোনার দাম বাড়তে শুরু করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের সময় সোনার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সোনার দাম স্থির কেন

বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর ধারায় ছেদ টানতে পারে। এমনকি তারা সুদের হার বাড়াতেও পারে, এমন সম্ভাবনা আছে।

এতে ডলারে বিনিয়োগ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। সাধারণত ডলারের আকর্ষণ বাড়লে সোনার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। কেননা, সোনায় বিনিয়োগ করে সুদ পাওয়া যায় না। এমনও দেখা যায়, সোনা ও ডলারের মূল্য একই সঙ্গে বৃদ্ধি পায়।

অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ে বলেন, বিনিয়োগকারীরা কিছুদিন ধরেই প্রত্যাশা করছেন, সুদের হার কমবে। আরেকটি কারণ হলো, বছরের শুরু থেকেই সোনার দাম বেশ চড়া ছিল। মিডওয়ে আরও বলেন, সোনার দাম আগেই এতটা বেড়েছে যে এখন যুদ্ধের প্রভাব সেভাবে পড়ছে না।

ব্রুগেল থিঙ্কট্যাংকের জ্যেষ্ঠ ফেলো রেবেকা ক্রিস্টির পর্যবেক্ষণও সে রকম। তাঁর মতে, এ বছর সোনা ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। ডলার শক্তিশালী হওয়াও তার একটি বড় কারণ। যেহেতু সোনার লেনদেন ডলারে হয়, সেহেতু ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া ডলার নিজেও বিকল্প ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম। তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে, যে কারণে ডলার আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

এখনো কি সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ

এই মুহূর্তে ততটা নয়। রেমি বুরজোর ভাষায়, ‘দুই বছর আগের মতো অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে সোনাকে এখন আর ততটা নির্ভরযোগ্য মনে করা হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, এখন অনেকেই সোনাকে জল্পনানির্ভর সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বড় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকি এড়িয়ে চলে। বর্তমান বাজারের অস্থিরতায় তারা কিছুটা সতর্ক হয়ে থাকতে পারে।

সামনে কী

মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সোনার দামের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেওয়া কঠিন। রেবেকা ক্রিস্টির মতে, আপাতত সোনার দাম আরও না বাড়ার বড় কারণ হলো, দাম আগেই অনেকটা বেড়ে আছে।

জেমস মিডওয়ের মতে, সোনার দামে বড় পরিবর্তন ঘটতে হলে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ফেডারেল রিজার্ভ যদি স্পষ্টভাবে জানায় যে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকা সত্ত্বেও সুদের হার কমানো হবে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়—এই ধারণায় পরিবর্তন এলে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকলে সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে আপাতত সোনার বাজারে বড় ধরনের উত্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।