যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা
যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা

যুক্তরাষ্ট্র এখন যত তেল আমদানি করছে, রপ্তানিও করছে তার কাছাকাছি

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা হয়েছে। বিষয়টি হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এই প্রথম আমদানিকে প্রায় ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারা নিট রপ্তানিকারক হওয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।

এ সময় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা তেলের বিকল্প উৎসের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ায় দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়। নিট রপ্তানিকারকের অর্থ হলো কোনো দেশ যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার চেয়ে বেশি রপ্তানি করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ইরানের হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও গ্যাস পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এই সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল এশিয়া ও ইউরোপের শোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহে ঝুঁকছে। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্রের তেলের চাহিদা হঠাৎই বেড়ে গেছে। তবে বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই রপ্তানি সক্ষমতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

গতকাল বুধবার মার্কিন সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের নিট আমদানি (আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান) কমে দৈনিক ৬৬ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। ২০০১ সাল থেকে পাওয়া সাপ্তাহিক পরিসংখ্যানের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। একই সময়ে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় দৈনিক ৫২ লাখ ব্যারেলে—সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বার্ষিক হিসাবে দেখা যায়, সর্বশেষ ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিট তেল রপ্তানিকারক ছিল।

রিস্ট্যাড এনার্জির তেলবাজার বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়ানিভ শাহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায়, আটলান্টিক অঞ্চল ও এশিয়ার ক্রেতারা তেলের জন্য আরও দূরে যাচ্ছেন। অঞ্চলভেদে তেলের দামে পার্থক্য আছে ঠিক, তবে পরিবহন ব্যয়ের কারণে তা সামলে নেওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি গ্রিসের মতো দেশ এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল কিনেছে।

জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানির দৈনিক প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল, অর্থাৎ প্রায় ৪৭ শতাংশ ইউরোপের বাজারে গেছে। আরও প্রায় ১৪ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল বা ৩৭ শতাংশ গেছে এশিয়ায়, এক বছর আগে যা ছিল ৩০ শতাংশ। শীর্ষ ক্রেতাদের মধ্যে ছিল নেদারল্যান্ডস, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়া।

কেপলারের তথ্য বলছে, ৫ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী একটি জাহাজ তুরস্কের পথে আছে। অন্তত এক বছরের মধ্যে এই প্রথম তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানি করছে।

ব্রেন্টের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল আকর্ষণীয়

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে তেল আমদানি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি কমে ৫৩ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। দেশটি এখনো বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। কারণ, তাদের শোধনাগারগুলো তুলনামূলক ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। কিন্তু তাদের খনি থেকে যে তেল উৎপাদিত হয়, তা মূলত হালকা প্রকৃতির।

মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় গত মাসে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামের ব্যবধান ব্যারেলপ্রতি ২০ দশমিক ৬৯ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির আগ্রহ কমে যায়, কিন্তু ইউরোপ ও এশিয়ার শোধনাগারগুলোর কাছে মার্কিন তেল আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

সোমবার ইউরোপে দ্রুত সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে। আফ্রিকার তেলের দামও নতুন উচ্চতায় উঠেছে বলে জানা গেছে।

রপ্তানি সক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র

কেপলারের বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ৫২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে; মাসিক ভিত্তিতেই যা সক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে।

বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, পাইপলাইনের সক্ষমতা ও জাহাজের সীমাবদ্ধতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল রপ্তানি করতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটির রপ্তানি সর্বোচ্চ ৫৬ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল।

দুবাইভিত্তিক তেল ব্যবসায়ী বেকজোদ জুখরিতদিনভ বলেন, গত সপ্তাহে ৫২ লাখ ব্যারেল রপ্তানি হয়েছে, এতেই বাজার কার্যত রপ্তানি সীমার কাছাকাছি চলে গেছে। বাস্তবতা হলো, এরপর প্রতিটি অতিরিক্ত ব্যারেল রপ্তানির খরচ আগের তুলনায় বেশি পড়বে, বিশেষ করে পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে।

রিস্ট্যাডের শাহ বলেন, কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে মাঝারি মানের উচ্চ সালফারযুক্ত তেল ছাড়লে আরও বেশি হালকা, কম সালফারযুক্ত মার্কিন তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ট্যাংকার সংকট ও বাড়তি ভাড়ার কারণে এই চাহিদা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ভর্টেক্সার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রোহিত রাঠোর বলেন, গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৮০টি খালি সুপারট্যাংকার মেক্সিকো উপসাগরের দিকে গেছে। এসব ট্যাংকার এপ্রিল ও মে মাসে তেল বোঝাই করা হতে পারে।