এলএনজি
এলএনজি

এবার শীতে গ্যাস–সংকট হতে পারে ইউরোপে, বাংলাদেশসহ এশিয়ার ঝুঁকি কোথায়

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ আবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপের অন্যতম প্রধান বিকল্প সরবরাহকারী হয়ে ওঠে কাতার। এখন তা–ও ঝুঁকিতে পড়ল। এতে এশিয়ার দেশগুলো আরও বেশি বিপাকে পড়বে। খবর দ্য ইকোনমিস্টের

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের এলএনজি সরবরাহ অনেকটা কমে গেছে। এতে একদিকে এশিয়ায় গ্যাসের দাম বেড়েছে; শীতের আগে ইউরোপের গ্যাসের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপের গ্যাসের মজুত সংকট ঘনীভূত হলে এশিয়ার পক্ষে এলএনজি পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, ইউরোপের দেশগুলো বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে পারবে। কিন্তু এশিয়ার দেশগুলোর পক্ষে তা সম্ভব না–ও হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষেও এলএনজি সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে দেশে এ সংকট শুরু হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে গেলে এ পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও ভূরাজনীতির ধাক্কায় বিশ্বের এলএনজি বাজার এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। স্বল্প মেয়াদে সরবরাহ–সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা, আবার দীর্ঘ মেয়াদে অতিরিক্ত সরবরাহ ও দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নতুন এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এগুলো হয়ে গেলে ২০৩০ সালের দিকে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ আসবে, তখন দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে কাতার ঘোষণা দেয়, তারা চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না। বাস্তবতা হলো, এ ঘোষণার পর তারা মাত্র ৯৮টি এলএনজি জাহাজের চালান পাঠাতে পেরেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫৩৬টি কম।

ফলে বাজারে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন এলএনজি ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা গত বছর বিশ্বে যত এলএনজি সরবরাহ হয়েছে, এর প্রায় ৯ শতাংশ। সংকট এখনো কাটেনি। এশিয়ায় এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২৫ ডলারে উঠেছে, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। তবে পরিস্থিতি এখনো ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ হয়নি। সে বছর এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ ডলারে উঠেছিল।

চলতি বছর এশিয়ার দেশগুলো এখন পর্যন্ত ১৯ কোটি ৩০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৭০ লাখ টন কম।

শীতের আগে ইউরোপে নতুন উদ্বেগ

ইউরোপের গ্যাসের মজুত এখন মাত্র ৭২ শতাংশ পূর্ণ আছে। বছরের এই সময়ে যা সর্বনিম্ন। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় মজুত ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। জার্মানির মজুত মাত্র ৫৭ শতাংশ।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিক্স ওয়ান কমোডিটিজ গত ১০ বছরের শীতের আবহাওয়ার তথ্য পরীক্ষা করে মডেলিং করেছে। তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির এত অবনতি হতে পারে যে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ইউরোপীয় কমিশন অবশ্য এখনো নভেম্বরের মধ্যে গ্যাসের মজুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার বাধ্যবাধকতা পুনর্বহাল করেনি। যুদ্ধের কারণে এই নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল।

শীত বাড়লে দাম উঠতে পারে ৪০ ডলারে

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষক ঝি শিন চং মনে করেন, শীত বেশি না পড়লে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে কাতারের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ইউরোপ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। তাতে গ্যাসের দাম কমে আসবে। তবে এই দুটি শর্তে অনিশ্চয়তা আছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নভেম্বরে অপ্রত্যাশিতভাবে ঠান্ডা পড়লে ইউরোপে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে। তখন প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠতে পারে। শীত আরও দীর্ঘ হলে এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের প্রতিযোগিতা বাড়বে। সেই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তো আছেই।

কাতারের বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব

কাতার এখনো এলএনজি উৎপাদনকেন্দ্রগুলো পুরোপুরি চালু করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে না তারা।

কাতারের এলএনজি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী শীতের আগে ইউরোপের মজুত পূরণ করতে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ২০২৭ সাল জুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়তি থাকতে পারে—এমন আশঙ্কা আছে।

তবে বর্তমান সংকটের মধ্যে এলএনজি বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে। যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।

অন্যদিকে সরবরাহ বাড়াতে বিভিন্ন দেশে যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু এখনো চলছে। ফলে বর্তমান সংকটের পর ভবিষ্যতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ হতে পারে।