বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার কৃতিত্ব কেবল ইলন মাস্কের নিজের নয়, এ যাত্রায় অনেকেই তাঁকে সহায়তা করেছেন। তাঁর কোম্পানিগুলোর প্রকৌশলীরা যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীরা আর্থিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিপুল অর্থ ঢেলেছেন। তবে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল মার্কিন করদাতা ও নীতিনির্ধারকদের।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গারবার কাওয়াসাকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও টেসলার প্রাথমিক বিনিয়োগকারী রস গারবার বলেন, সরকারের সহায়তা না থাকলে টেসলা ও স্পেসএক্সের অস্তিত্বই থাকত না।
শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার স্পেসএক্সকে ৫০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দেয়। তবে টেসলা সরকারের কাছ থেকে যে অনুদান, ঋণ ও নীতিগত সুবিধা পেয়েছে, সে তুলনায় এই ৫০ কোটি ডলার নস্যি।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে স্পেসএক্সের সাফল্য বা টেসলার প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য পুরোপুরি সরকারি আনুকূল্যের ফসল। সত্য হলো, শুরুর দিকে সরকারি সহায়তা না পেলে দুটি প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকতে পারত না।
শুরুর পুঁজি জুগিয়েছে সরকার
মাস্কের এক ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের কতটা সরকারি সহায়তা থেকে এসেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সহজ নয়। সরাসরি হিসাব করলে দেখা যায়, তাঁর কোম্পানিগুলো সরকারি চুক্তি ও কর্মসূচি থেকে শত শত কোটি ডলার পেয়েছে। কিন্তু শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, কখন সেই অর্থ এসেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৬ সালে নাসা স্পেসএক্সকে ফ্যালকন রকেট ব্যবস্থা ও ড্রাগন মহাকাশযান তৈরির জন্য ২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অনুদান দেয়। সে সময় স্পেস শাটল কর্মসূচি শেষ হচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারী ও মালামাল পাঠানোর নতুন উপায় খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্র।
বেসরকারি কোম্পানির মূল্যায়ন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান পিচবুকের তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল স্পেসএক্সের জন্য প্রথম বড় আর্থিক সহায়তা; পরে মোট অনুদানের পরিমাণ ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।
মহাকাশনীতিবিষয়ক সংগঠন দ্য প্ল্যানেটারি সোসাইটির কর্মকর্তা কেইসি ড্রেয়ার বলেন, তখন পর্যন্ত তারা যত মূলধন তুলেছিল, এর প্রায় অর্ধেকই এসেছিল এই অনুদান থেকে। এ ক্ষেত্রে নাসার বড় অঙ্গীকার ছিল।
এরপরও সহায়তা থেমে থাকেনি। ২০০৮ সালের শেষ দিকে স্পেসএক্স প্রায় নগদ অর্থশূন্য হয়ে পড়েছিল। তখন নাসা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৬০ কোটি ডলারের বড় চুক্তি করে। এ চুক্তি কোম্পানিটিকে কার্যত টিকিয়ে রাখে।
২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রথমবারের মতো ফ্যালকন-৯ উৎক্ষেপণের সময় মাস্ক নিজেই স্বীকার করেন, ‘নাসার সহায়তা ছাড়া আমরা স্পেসএক্স শুরু করতে পারতাম না, এ পর্যায়ে আসতেও পারতাম না।’
নীতিগত সুবিধায় টিকে ছিল টেসলা
অন্যদিকে টেসলার সঙ্গে সরাসরি সরকারের চুক্তি তুলনামূলকভাবে কম হলেও শুরুতে তারা যে সহায়তা পেয়েছিল, তার গুরুত্ব আছে। টেসলার সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তা এসেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি ক্রেতাদের কর-সুবিধা থেকে নয়; বরং গাড়িশিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সরকারের নীতিগত কাঠামো থেকে।
২০১০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত টেসলার ইতিহাসে বিক্রি হওয়া গাড়ির সংখ্যা ছিল ২ হাজারের কম। এর প্রায় সবই ছিল বৈদ্যুতিক, কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী মডেল, যেগুলো তৈরি হয়েছিল তুলনামূলক কম পরিচিত ব্রিটিশ কোম্পানি লোটাসের স্পোর্টস কারের আদলে।
এরপরই টেসলা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ থেকে স্বল্প সুদে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঋণ পায়। তাদের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির কয়েক মাস আগেই এই ঋণ দেওয়া হয়েছিল।
এই ঋণের অর্থেই কোম্পানিটি তৈরি করে টেসলা মডেল এস, এটি ছিল তাদের প্রথম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য। পরে ২০১৩ সালে নতুন করে শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে টেসলা এই ঋণ নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিশোধ করে।
একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রেতাদের জন্য ৭ হাজার ৫০০ ডলারের করছাড়ের সুবিধা টেসলা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুযোগ হয়ে আসে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারের স্বাভাবিক দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারে।
এ সুবিধা বন্ধ হওয়ার আগে, অর্থাৎ ২০১৯ সাল পর্যন্ত টেসলার ক্রেতারা ফেডারেল করছাড় হিসেবে আনুমানিক ৩৪০ কোটি ডলারের সুবিধা পেয়েছিলেন।
এরপর এই সুবিধা শেষ হলে চাহিদা ধরে রাখতে টেসলা গাড়ির দাম কমিয়ে দেয়। কতটা মূল্য কমাতে হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, এই করছাড়ের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া গাড়ি থেকে টেসলা অন্তত ১০০ কোটি ডলারের বেশি অতিরিক্ত আয় করতে পেরেছিল।
পরে ২০২৩ সালে বাইডেন প্রশাসনের ‘ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্টের’ আওতায় এই করছাড় আবার চালু হয়। তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের উদ্যোগে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে পুরো শিল্প খাতেই এই সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়।
তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রেতাদের জন্য দেওয়া করছাড় থেকে টেসলা সবচেয়ে বড় সুবিধা পায়নি; বরং তারা সেটা পেয়েছে গাড়িশিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমাতে চালু করা সরকারের কর্মসূচি থেকে।
এ নীতিমালার আওতায় গাড়ি কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট মাত্রার নিঃসরণসীমা মেনে চলতে হতো। কোনো প্রতিষ্ঠান সেই সীমা মানতে ব্যর্থ হলে তাদের যেটা করতে হতো, সেটা হলো যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চলছে, তাদের কাছ থেকে ‘নিঃসরণ ক্রেডিট’ কেনা।
টেসলার সব গাড়ি বৈদ্যুতিক হওয়ায় তারা সব সময়ই নির্ধারিত নিঃসরণসীমার নিচে থাকত। ফলে তাদের হাতে বিক্রির জন্য সব সময় এই ক্রেডিট থাকত। এর অর্থ হলো, সরকারের এই নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বড় গাড়ি কোম্পানিকেই টেসলাকে অর্থ দিতে হতো।
শুধু ২০০৮ সালেই টেসলার মোট আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ এসেছে এই ক্রেডিট বিক্রি থেকে। পরবর্তী পাঁচ বছরেও কোম্পানিটির মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশের উৎস ছিল এই খাত।
এখন ভরসা ওয়াল স্ট্রিটের আস্থা
এখন টেসলার মূল্য শুধু গাড়ি ব্যবসার ওপর নির্ভর করে না; বরং কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অনেকটাই নির্ভর করছে মাস্কের প্রতিশ্রুতির ওপর। সেটা হলো, টেসলা শিগগিরই স্বচালিত রোবোট্যাক্সি ও মানবসদৃশ রোবট বাজারে আনবে।
মাস্কের সম্পদ যে নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে, তার প্রধান কারণ এখন ওয়াল স্ট্রিটের আস্থা। তবে এই আস্থার ভিত্তি হচ্ছে শুরুর দিকের সরকারি সহায়তা।
রস গারবার বলেন, শেষ পর্যন্ত এই কোম্পানিগুলো সরকার, আমেরিকা ও সমাজের জন্য ভালোই হয়েছে। সরকার অর্থ দিয়েছে, তা নিয়ে আফসোস নেই। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল, এর বিনিময়ে মালিকানার অংশ নেওয়া। সেটা না করাটা ছিল ভুল।