যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা
যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা

তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, মার্কিন ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যেন এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একেবারেই ঘৃণা করতে শুরু করেছে। মার্কিন ভোক্তাদের মনোভাব নিয়ে বহুল আলোচিত ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের সর্বশেষ জরিপ বলছে, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা আস্থার সূচক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

টানা তৃতীয় মাসের মতো মে মাসেও ভোক্তা আস্থার সূচক কমেছে। সূচকটি নেমে এসেছে ৪৪ দশমিক ২ পয়েন্টে, গত এপ্রিল মাসে যা ছিল ৪৯ দশমিক ৮। অর্থাৎ মে মাসে সূচক আগের সর্বনিম্ন রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। খবর সিএনএনের

এই পরিস্থিতি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নেতিবাচক বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের তথ্যানুসারে, পৃথিবীতে যত আমদানি বাণিজ্য হয়, তার ১৩ দশমিক ২ শতাংশই করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এই দেশের ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া মানে অনেক উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানি কমে যাওয়া।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ, ফলে তেলের সরবরাহ সংকট ও দামের ধাক্কা—এসব পরিস্থিতির কারণে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। এর আগে টানা কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকটে মানুষের মনোভাব এমনিতেই ছিল নেতিবাচক।

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের সার্ভেস অব কনজিউমারসের পরিচালক জোয়ান হসু বিবৃতিতে বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো মানুষের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। ৫৭ শতাংশ ভোক্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছেন, উচ্চ মূল্য তাঁদের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গত মাসে এ হার ছিল ৫০।’

জোয়ান হসু আরও বলেন, মে মাসে ভোক্তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতা ১৩ শতাংশ কমে গেছে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জরিপ ১৯৫২ সাল থেকে হয়ে আসছে। দেখা যাচ্ছে, ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকট, নাইন-ইলেভেন হামলা, কোভিড-১৯ মহামারি কিংবা পরবর্তী মূল্যস্ফীতির সময়ের চেয়েও এখন আমেরিকানরা নিজেদের পরিস্থিতি নিয়ে এখন বেশি হতাশ।

হসু বলেন, সবচেয়ে বেশি হতাশা বেড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ ও যাঁদের কলেজ ডিগ্রি নেই, তাঁদের মধ্যে। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এই শ্রেণির মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি পড়েছে।

যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম নতুন বোঝা

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আবারও ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি প্রায় তিন মাস ধরে কার্যত অচল।

জোয়ান হসু বলেন, ‘বছরের শুরুতে ভোক্তারা হয়তো ভেবেছিলেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু তিন মাস পার হওয়ার পর এখন তাঁরা মনে করছেন, সরবরাহব্যবস্থার এই সংকট দ্রুত কাটবে না।’

হসুর মতে, ভোক্তারা আশঙ্কা করছেন, তেল ও গ্যাসের উচ্চ মূল্য পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামও আরও বেড়ে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে আগামী এক বছরের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা মে মাসে বেড়েছে, এপ্রিলে যা ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, মে মাসে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।

গত বছরের শেষ দিকে শুল্ক আরোপের কারণে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা প্রায় সেই পর্যায়ে ফিরে গেছে। হসু জানান, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্বতন্ত্র ও রিপাবলিকান–ঘনিষ্ঠ ভোটারদের মধ্যে।

বাস্তবতা হলো, রিপাবলিকান সমর্থকদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এখন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় মাসভিত্তিক হিসাবে দ্বিগুণেরও বেশি।

ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কত দ্রুত বাড়তে পারে, সে বিষয়ে মানুষের প্রত্যাশা কী, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কেননা মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে দাম আরও বাড়তেই থাকবে, তাহলে তারা এখনই বেশি খরচ করতে পারে, বেশি মজুরি দাবি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বাড়তি চাহিদা ও ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে দাম বাড়াতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়া আশঙ্কা থাকে।

এমন হতাশাজনক মনোভাবের মধ্যেও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল বলেই মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারও নতুন উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে। তবে সব আমেরিকান সেই ইতিবাচক পরিস্থিতি অনুভব করছেন না।

এফডব্লিউডিবন্ডসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টোফার রুপকি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বিবৃতিতে বলেন, ‘আমেরিকান ভোক্তারা এখন টিকে থাকার লড়াই করছেন। আয়কর ফেরতের অর্থ হয়তো ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে, অথবা বাড়তি দামের পেছনে খরচ হয়ে গেছে।’

রুপকি আরও বলেন, শেয়ারবাজারের রেকর্ড উচ্চতাও ভোক্তাদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে না। এর অর্থ হলো, অধিকাংশ আমেরিকানের সম্পদ অবসর ভাতা হিসাবের মধ্যে আটকে আছে। কিন্তু সেই ভাতা এখনকার জীবন সহজ করতে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ। দেশটি মূলত ভোক্তা পণ্য, ইলেকট্রনিকস, গাড়ির যন্ত্রাংশ, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি আমদানি করে। দেশটির মানুষের উচ্চ ক্রয়ক্ষমতার কারণে তারা সারা বিশ্বের বাজারে পরিণত হয়েছে। ফলে তাদের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে। এই বাণিজ্যঘাটতি পূরণ করতেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন।