ওয়ারেন বাফেট
ওয়ারেন বাফেট

এআই খাতে ওয়ারেন বাফেটের দূরদর্শী বিনিয়োগ, কীভাবে মুনাফা করছেন

প্রথাগত ও স্থিতিশীল ব্যবসায় বিনিয়োগ করেই বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বিনিয়োগকারী হয়েছেন ওয়ারেন বাফেট। বিমা, রেলপথ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো তুলনামূলক নীরস ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়েকে শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে তাঁর লেগেছে ছয় দশক।

৯৬ বছর বয়সী বাফেট গত শুক্রবার বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থানের মধ্যেও নিজের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ নীতি থেকে সরে যাননি তিনি। যে ব্যবসা তিনি বোঝেন, সেই ব্যবসাতেই বিনিয়োগ করেছেন তিনি। এটাই ছিল তাঁর মূলনীতি। খবর সিএনএন

তবে এআইয়ের ঢেউয়ে বার্কশায়ারও সওয়ার হয়েছে। অ্যাপল ও অ্যালফাবেটের মতো এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে তাদের বিনিয়োগ আছে। তবে এআইয়ের মোহে পড়েনি বার্কশায়ার, এসব কোম্পানির পেছনে সব অর্থ ঢালেনি তারা। তারপরও এআই অবকাঠামো গড়ে ওঠার ফলে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বার্কশায়ার এই খাতে আরও বিনিয়োগ করতে পারে।

এআই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। ডেটা সেন্টার নির্মাণের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো এআইয়ের উত্থানের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বড় ইউটিলিটি কোম্পানির মালিকানা আছে বার্কশায়ারের। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করে, এমন কোম্পানিও আছে তাদের মালিকানায়।

এআইয়ের বাজি জ্বালানিতে

যেসব কোম্পানিতে বার্কশায়ারের বড় বিনিয়োগ আছে, তার মধ্যে অ্যাপল অন্যতম। ২০১৬ সালে বাফেট এই বিনিয়োগের উদ্যোগ নেন। তখন তিনি মনে করতেন, অ্যাপল ভোক্তা পণ্যভিত্তিক ব্যবসা। এই কোম্পানি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে।

চলতি বছরের জুনে বার্কশায়ার অ্যালফাবেটে বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। তবে গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের ব্যবসায় নয়, এবার সরাসরি এআই খাতে বিনিয়োগ করে বার্কশায়ার। ফলে এটা তাদের আগের বিনিয়োগ কৌশল থেকে কিছুটা ভিন্ন। তবে বার্কশায়ারের এআই-সাফল্যের বড় ভিত্তি হলো বিদ্যুৎ।

২০০০ সালে বার্কশায়ার মিডআমেরিকান এনার্জি নামের এক ইউটিলিটি কোম্পানি কেনে। কোম্পানিটি আইওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তখন অবশ্য এই বিনিয়োগের সঙ্গে এআইয়ের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু দুই দশক পর এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা যখন বাড়তে শুরু করেছে, তখন ইউটিলিটি কোম্পানির মালিকানা বার্কশায়ারের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে।

মাহোনি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কেন মাহোনি বলেন, এআইয়ের সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন হলো জ্বালানি ও ইউটিলিটি—বার্কশায়ার আগে থেকেই এই দুটি খাত থেকে লাভবান হওয়ার মতো অবস্থানে ছিল। তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি ছাড়া অর্থনীতি চলতেই পারে না, সেগুলোর মালিকানা থাকা দরকার, বাফেট এটা অনেক আগেই বুঝেছেন। বিষয়টা হলো, অনেক সময় নীরস বিনিয়োগ থেকেই সবচেয়ে ধারাবাহিক মুনাফা আসে।

মিডআমেরিকান আইওয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। আইওয়া বর্তমানে ডেটা সেন্টারের অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বার্কশায়ারের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ অ্যাবেল গত মে মাসে বার্কশায়ারের বার্ষিক সম্মেলনে বলেন, গত বছর আইওয়ায় বার্কশায়ারের যত বিদ্যুৎ লেগেছে, তার ৮ শতাংশের চাহিদা ডেটা সেন্টারে।

সিএফআরএ রিসার্চের পরিচালক ক্যাথি সিফার্ট বলেন, মিডআমেরিকান কেনার সময় এআই কাজে লাগানোর বিষয় ছিল না, সে অর্থে এটা কিছুটা ভাগ্য ও সৌভাগ্যের বিষয়। তবে তাঁর মতে, এআইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়েকে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

সিফার্ট বলেন, ভালো কোম্পানি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বাফেটের যে দক্ষতা, এটা তারই ফল। এখন এসব কোম্পানি এআইয়ের সুবিধা পাচ্ছে। সেই সঙ্গে এআইয়ের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নেভাদায় আরেক ইউটিলিটি কোম্পানি এনভি এনার্জিও বার্কশায়ারের মালিকানায় আছে। যেসব অঙ্গরাজ্যে দ্রুত ডেটা সেন্টারের বিস্তার হচ্ছে, নেভাদা তার মধ্যে একটি। এআইয়ের ক্ষেত্রে বাফেট এ রকম আরও কিছু অনিচ্ছাকৃত বাজি ধরেছেন।

২০১৬ সালে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে প্রিসিশন কাস্টপার্টস কেনে। কোম্পানিটি টারবাইনে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য ও যন্ত্রাংশ তৈরি করে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটরের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো টারবাইন। একপর্যায়ে এই অধিগ্রহণের জন্য বার্কশায়ারকে ১১ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের হিসাব সমন্বয় করতে হয়। তখন বাফেটও স্বীকার করেছিলেন, কোম্পানিটি কিনতে তিনি ‘অতিরিক্ত দাম’ দিয়েছেন।

এআইয়ের বাড়বাড়ন্তের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসচালিত টারবাইনের কাটতিও এখন দ্রুত বাড়ছে। প্রিসিশন কাস্টপার্টস এ খাতের প্রয়োজনীয় জটিল যন্ত্রাংশ তৈরি করে। বার্কশায়ারভিত্তিক তহবিল ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ভিসটাশেয়ারসের প্রধান নির্বাহী অ্যাডাম প্যাট্টি বলেন, ‘ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো টারবাইন। অর্থাৎ প্রিসিশন কাস্টপার্টস এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটি বানাচ্ছে।

ওয়ারেন বাফেটের সম্পদ

ওয়ারেন বাফেট এখন বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস। এই প্রতিবেদন লেখার সময় ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যানুসারে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ১৪ হাজার ৪৬০ কোটি ডলার। নিজের সম্পদের ৯৯ শতাংশের বেশি দান করার অঙ্গীকার করেছেন বাফেট। এখন পর্যন্ত তিনি ৭২ বিলিয়ন ডলারের বেশি দান করেছেন। এর বড় অংশ গেছে গেটস ফাউন্ডেশন ও বাফেটের সন্তানদের পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলোর মাধ্যমে।

২০১০ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের সঙ্গে মিলে বাফেট ‘গিভিং প্লেজ’ উদ্যোগ শুরু করেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য, বিশ্বের ধনীদের অন্তত সম্পদের অর্ধেক দাতব্য কাজে দান করার অঙ্গীকারে উৎসাহিত করা।