
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নানামুখী টানাপোড়েনের মধ্যেও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে টিকে রয়েছে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাত। করোনা-পরবর্তী ধাক্কা, ভূরাজনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলারসংকটের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের এসএমই উদ্যোক্তারা তাঁদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এবারের বিশ্ব এসএমই দিবসে তাই মূল আলোচনা দাঁড়িয়েছে—কীভাবে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এই খাতকে টেকসই করা যায় এবং অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংকগুলো কীভাবে প্রকৃত সহযোগী হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের এসএমই খাত এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে অনেক ছোট উদ্যোগ বড় বড় শিল্পের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
তবে এই সংকটই আবার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন অনেক উদ্যোক্তা। ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সংযোগ শিল্প হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ধরে রাখতে এসএমই খাতের এই রূপান্তর অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
এসএমই খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হলো সময়মতো এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন না পাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ সিএমএসএমই উদ্যোক্তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ বছরের ব্যবধান ও অগ্রগতি বেশ হয়েছে। বর্তমানে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১৩ সালের শুমারিতে দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। দেশের মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৯ শতাংশই সিএমএসএমই। এক দশকের ব্যবধানে দেশে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ২২৭টি। এই প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। বর্তমানে মোট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাইক্রো শিল্পে রয়েছে ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, কুটির শিল্পে ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ এবং মাঝারি শিল্পে দশমিক ৩১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। বাকি মাত্র দশমিক ০৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বৃহৎ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। শিল্প খাতে নিয়োজিত মোট জনবলের প্রায় ৮৫ শতাংশ বা ৩ কোটির বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এই খাতে।
অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও দেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) এসএমই খাতের অবদান ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। সরকার আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিসিক শিল্পনগরী সম্প্রসারণ করছে।
এ বিষয়ে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান এখনো কম। এসএমই খাতের যত বেশি ব্যাপ্তি ছড়ানো থাকবে, তত অর্থনীতিতে অবদান বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক সিএমএসএমই চলতি মূলধনের ঘাটতি পূরণে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। আরও ৫০০ ও ৩০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। সরকার জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৫ শতাংশ বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজাটে সরকার এসএমই খাতের টেকসই উন্নয়নে আরও ২ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই অর্থায়নে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও এসএমই খাতের উন্নয়ন হবে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে এসএমই খাতকে বৈশ্বিক মানের ও টেকসই করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলিয়ে নয়, এসএমই খাতের জন্য কর ও অর্থায়ন সুবিধা আলাদাভাবে দিতে হবে। তাহলে এসএমই খাতের উন্নতির মাধ্যমে আরও প্রসারিত হবে। ফাউন্ডেশন এই উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো সহযোগিতা দিতে কাজ করছে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রান্তিক পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি ও বিকাশের বাজেটে বিশেষ তহবিল ঘোষণা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে আমরা এই প্রক্রিয়ায় একটি অপরিহার্য সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছি।’