বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) পূর্ণকালীন চেয়ারম্যান পদের জটিলতায় ৯২ হাজার পদের দুটি বড় নিয়োগ কার্যক্রম পুরোপুরি আটকে গেছে। গত ২৬ এপ্রিল নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় তিনি দায়িত্ব নিতে পারেননি। অন্যদিকে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অপারগতা জানিয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পদে বসা নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা এবং কর্মকর্তাদের অনীহার কারণে বড় ধরনের নিয়োগজট তৈরি হয়েছে।
দুই মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েন ও কর্মকর্তাদের ‘ফন্দিফিকির’
সরকারি নথি ও এনটিআরসিএ সূত্র অনুযায়ী, গত ৩০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। এর আগেই শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশের পরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের ফাইলটি অনুমোদন করা হয়নি। এর ফলে প্রজ্ঞাপন জারির দেড় মাস পরও নতুন চেয়ারম্যান দপ্তরে বসতে পারেননি।
কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের মতে, এনটিআরসিএ পদটি আমলাদের কাছে মূলত একটি ‘ট্রানজিশন’ বা অন্তর্বর্তীকালীন চারণভূমি। কোনো কর্মকর্তা এখানে স্থায়ীভাবে কাজ করতে বা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব নিতে চান না।
অভিযোগ রয়েছে, অনেকে এই সংস্থায় এসে বড় কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়েই সময় পার করেন অনেকেই। এই সময়টাকে তাঁরা ব্যবহার করেন সচিব বা তার চেয়ে বড় কোনো পদ ভাগিয়ে নেওয়ার ফন্দিফিকির ও তদবিরের কাজে। ফলে শিক্ষা কিংবা নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের চেয়ে কর্মকর্তাদের নিজস্ব ক্যারিয়ারের হিসাব-নিকাশই এখানে প্রধান হয়ে ওঠে।
৯ম শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার তারিখও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নিএ এম এম রিজওয়ানুল হক, এনটিআরসিএয়ের সচিব
পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনটিআরসিএর পরীক্ষা মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন অনুবিভাগের সদস্য মুহম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকীকে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী নিয়োগ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ আইনি ক্ষমতা থাকলেও তিনি বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। এনটিআরসিএর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, স্থায়ী পদায়ন না হওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এই দুটি বড় নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপারগতা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুহম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ১৮ এপ্রিল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান পদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২২ এপ্রিল প্রকাশিত ফলাফলে প্রায় ৫৩ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৪ হাজার ৯৪২ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। ফলাফল প্রকাশের পর দেড় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) তারিখ নির্ধারণ করতে পারেনি এনটিআরসিএ। দ্রুত মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে ৫ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা।
এ বিষয়ে ৮ জুন সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) পদ্ধতিতে নেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রক্রিয়া চালুর আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে ম্যানুয়ালি ভাইভা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে প্রথমবারের মতো শিক্ষক নিবন্ধন সনদের পরিবর্তে সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি চালু করছে এনটিআরসিএ। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় ‘নবম শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা’আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। এনটিআরসিএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ এপ্রিল দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য পদের চাহিদা (ই-রিকুইজিশন) গ্রহণ শেষ হয়েছে। এতে মোট ৭৭ হাজার ৭৯৯টি শূন্য পদের তালিকা জমা পড়েছে। বিপুল পরিমাণ এই পদের বিপরীতে পরীক্ষা আয়োজনের দাপ্তরিক প্রস্তুতি থাকলেও পূর্ণকালীন চেয়ারম্যান না থাকায় নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
সার্বিক স্থবিরতা নিয়ে এনটিআরসিএয়ের সচিব এ এম এম রিজওয়ানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘৯ম শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার তারিখও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।’