আজ ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘সিভিল সার্ভিস দিবস’। সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব, কর্মের স্বীকৃতি এবং জনসেবার প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার স্মরণ করার জন্য এ দিবসের তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু দিবসটি উদ্যাপনের পাশাপাশি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসে—আমাদের সিভিল সার্ভিস কতটা ‘সিভিল’ এবং কতটা ‘সার্ভিস’? সরকারি কর্মচারীরা কি জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কারণে কোথাও কোথাও তাঁদের মধ্যে জনগণের ওপর প্রভুত্ব বিস্তারের মানসিকতা তৈরি হয়েছে?
প্রশ্নটি অমূলক নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন না করা কেন্দ্রিক সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে প্রায়ই সংবাদ প্রকাশিত হয়। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কর্মকর্তার মর্যাদা নির্ভর করার কথা তাঁর পদ, দায়িত্ব, দক্ষতা, সততা ও আচরণের ওপর নাগরিক তাঁকে কী সম্বোধন করলেন, তার ওপর নয়। ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ যদি স্বতঃস্ফূর্ত সম্মানের প্রকাশ হয়, তাতে আপত্তির কারণ নেই। কিন্তু সেটি যদি নাগরিকের কাছ থেকে প্রশাসনিক আনুগত্য আদায়ের অলিখিত শর্তে পরিণত হয়, তাহলে তা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক সিভিল সার্ভিসের বিকাশ কোনো কল্যাণরাষ্ট্রের আদর্শ থেকে হয়নি বরং ঔপনিবেশিক শাসনকে কার্যকর করার প্রয়োজন থেকেই এর বিকাশ।
সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক সিভিল সার্ভিসের বিকাশ কোনো কল্যাণরাষ্ট্রের আদর্শ থেকে হয়নি বরং ঔপনিবেশিক শাসনকে কার্যকর করার প্রয়োজন থেকেই এর বিকাশ। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ রাজপরিবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এ অঞ্চলে বাণিজ্যের সনদ দেয়। ১৬০৮ সালের ২৪ আগস্ট গুজরাটের সুরাত বন্দরে নোঙর করে তারা। বণিক বেশে এলেও সময়ের সঙ্গে কোম্পানি সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জন করে। রাজস্ব আদায়, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার জন্য একটি সুসংগঠিত অসামরিক কর্মীবাহিনী গড়ে ওঠে। সামরিক অফিসারদের থেকে আলাদা করতেই এই অসামরিক কর্মীদের ‘সিভিলিয়ান’ বা ‘সিভিল সার্ভেন্ট’ নামে অভিহিত করা হয়।
১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধের পর বাংলার রাজস্ব ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কোম্পানির হাতে চলে গেলে এই প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্ব আরও বাড়ে। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের রাজস্ব প্রশাসন পুনর্গঠন, জেলা পর্যায়ে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং পরবর্তী কর্নওয়ালিসীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫৩ সালের পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা এবং ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ ক্রাউনের সরাসরি শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়।
সে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল জনগণের কল্যাণ নয় বরং রাজস্ব আদায়, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের স্বার্থ রক্ষা। ফলে সেই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কর্তৃত্ব, দূরত্ব এবং প্রভুত্বের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। ফলে প্রশাসন ও জনগণের সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের চরিত্র বদলালেও প্রশাসনিক কাঠামো ও মানসিকতার অনেক উপাদান রয়ে গেছে—এটাই আজকে বড় উদ্বেগের বিষয়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হলে পাকিস্তান উত্তরাধিকারসূত্রে পায় ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের প্রশাসনিক ঐতিহ্য। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো একক সিভিল সার্ভিস পায়নি। পাকিস্তান আমলের অল-পাকিস্তান সার্ভিস, সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস এবং বিভিন্ন প্রাদেশিক সার্ভিস মিলিয়ে ছিল বহুধাবিভক্ত চাকরি কাঠামো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও বিভিন্ন প্রাদেশিক সার্ভিস ছিল—ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস, শিক্ষা সার্ভিসসহ নানা পেশাগত ও প্রশাসনিক সার্ভিস। খণ্ড খণ্ড বিচ্ছিন্ন সার্ভিস, অসংখ্য পদমর্যাদা এবং প্রায় ২২০০টি বেতন স্কেলের জটিল কাঠামোকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উপযোগী করে পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এ বাস্তবতায় ১৯৭২ সালের মার্চে গঠিত হয় ‘প্রশাসনিক ও চাকরি পুনর্গঠন কমিটি’ (এএসআরসি) এবং একই বছরের জুলাইয়ে গঠিত হয় জাতীয় বেতন কমিশন। এএসআরসি ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের শ্রেণিভিত্তিক চাকরি কাঠামো বিলোপ করে একটি একক, শ্রেণিহীন ও গ্রেডভিত্তিক সিভিল সার্ভিস গঠনের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে জাতীয় বেতন কমিশন প্রায় ২২০০টি বেতন স্কেলকে মাত্র ১০টি জাতীয় বেতন স্কেলে রূপ দেওয়ার সুপারিশ করে।
১৯৭২ সালের মার্চে গঠিত হয় ‘প্রশাসনিক ও চাকরি পুনর্গঠন কমিটি (এএসআরসি) এবং একই বছরের জুলাইয়ে গঠিত হয় জাতীয় বেতন কমিশন। এএসআরসি ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের শ্রেণিভিত্তিক চাকরি কাঠামো বিলোপ করে একটি একক, শ্রেণিহীন ও গ্রেডভিত্তিক সিভিল সার্ভিস গঠনের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে জাতীয় বেতন কমিশন প্রায় ২২০০টি বেতন স্কেলকে মাত্র ১০টি জাতীয় বেতন স্কেলে রূপ দেওয়ার সুপারিশ করে।
এ উদ্যোগের দর্শন ছিল পরিষ্কার—স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় চাকরি হবে বৈষম্যহীন, সমন্বিত এবং জনমুখী। প্রশাসন হবে জনগণের সেবার জন্য ঔপনিবেশিক শাসনের অনুকরণে বিশেষ কোনো চাকরিকে অভিজাত শ্রেণিতে উন্নীত করার জন্য নয়।
১৯৭৩ সালে এএসআরসি দুই খণ্ডে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। ১৯৭৩ সালে এজন্য চাকরিসমূহ (পুনর্গঠন ও শর্তাবলি) অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে এটা সংসদে আইন আকারে পাসও হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান আমলের সিএসপি ও ইপিসিএস অফিসারদের বাধার মুখে তখন এ প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৭৬ সালে গঠিত ‘পে অ্যান্ড সার্ভিসেস কমিশন’ বা রশিদ কমিশন পরবর্তী সময়ে সিভিল সার্ভিস পুনর্গঠনের সুপারিশ করে।
রশিদ কমিশনের দর্শনেও ছিল একটি যুগান্তকারী চিন্তা। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, পেশাজীবী এবং দক্ষ সাধারণ প্রশাসকদের সমন্বয় ঘটানোর কথা বলা হয়। একই সঙ্গে সব ক্যাডারের মেধাবী ও উজ্জ্বল রেকর্ডের অধিকারী কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ‘সুপিরিয়র পলিসি পুল’ বা উচ্চতর নীতি-পুল গঠনের প্রস্তাব করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী শীর্ষ পর্যায় কোনো একটি ক্যাডারের একচেটিয়া ক্ষেত্র হবে না; মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন ক্যাডার থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় বাছাই করে সেখানে আনা হবে।
এ কমিশনের রিপোর্টের আলোকেই ১৯৭৯ সালের ২৩ আগস্ট সিনিয়র সার্ভিস পুল অর্ডারের মাধ্যমে দ্বিস্তরি সিভিল সার্ভিসের প্রথম স্তর গঠিত হয়। ১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাঠপর্যায়ের ২৮টি সার্ভিসকে ১৪টি ক্যাডারে একীভূত করে দ্বিতীয় স্তর গঠিত হয়। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাডার এবং সচিবালয়ে উপসচিব থেকে সচিব পর্যায়ের পদ নিয়ে গড়ে ওঠে দুটি পরস্পর-সম্পর্কিত স্তর। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে বিসিএস (স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা) ক্যাডার বিভক্ত হয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা নামে দুটি ক্যাডার হয় এবং বিসিএস (সমবায়) ক্যাডার গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে সাব-ক্যাডার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ৩০টি ক্যাডারের কাঠামো গড়ে ওঠে। ১৯৯২ সালে প্রশাসন ও সচিবালয় ক্যাডার একীভূত হয়। পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়া, টেলিযোগাযোগ ক্যাডারের বিলুপ্তি এবং অর্থনৈতিক ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার ফলে বর্তমানে বিসিএস ক্যাডারের সংখ্যা ২৬।
অর্থাৎ গত চার দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস একটি দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান কাঠামোয় এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই কাঠামো কি তার মূল দর্শন ধরে রাখতে পেরেছে?
রাষ্ট্রীয় সেবা-পরিষেবাগুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো, সহজলভ্য করা কিংবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য দরকার একদল চৌকস ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা। অফিসাররা তাঁদের কর্মদক্ষতার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সার্ভিসভিত্তিক সরকারি সেবা-পরিষেবা প্রদান ব্যবস্থা উন্নত, দ্রুততর ও আধুনিক করবেন। এ পরিকল্পনা থেকেই সেবা খাতের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রোফেশনাল সার্ভিসগুলোও সিভিল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সরকারি চাকরি নিছক জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা নয় এটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় পরিষেবা দেওয়ার সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সেবা ও পরিষেবার মধ্যে পার্থক্য কী? যে কাজ নিঃস্বার্থে করা হয়, যে কাজের বিনিময়ে কোনো কিছু প্রত্যাশা করা হয় না, সেটা হলো সেবা। আর যখন অর্থ বা অন্য কিছুর বিনিময়ে অপরের জন্য কাজ করা হয় তাকে বলে পরিষেবা৷ একজন কর্মকর্তা জনগণের ‘চাকর’ নন—তিনি জনগণের জন্য নিয়োজিত একজন পরিষেবক। তাঁর পদমর্যাদা যত উঁচুই হোক, নাগরিকের মর্যাদা তার নিচে নয়। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকারী প্রশাসনিক মনস্তত্ত্বের অনেক উপাদান এখনো টিকে আছে। নাগরিকের সঙ্গে কর্মকর্তার দূরত্ব, ক্ষমতার প্রদর্শন, সম্বোধন নিয়ে সংবেদনশীলতা তারই বহিঃপ্রকাশ।
সিভিল সার্ভিস শুধু জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্বের সমস্যায় আটকে নেই এর অভ্যন্তরেও এক ক্যাডারের সঙ্গে অন্য ক্যাডারের মর্যাদা, পদোন্নতি ও সুযোগের বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। অর্থাৎ জনগণ বনাম প্রশাসন—এই দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ক্যাডার বনাম ক্যাডারের বৈষম্যও আজ সিভিল সার্ভিসের বড় বাস্তবতা।
সিনিয়র সার্ভিস পুলের মূল ধারণা ছিল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডার থেকে যোগ্য কর্মকর্তা বাছাই। এমনকি ১৯৮৭ সালে এ লক্ষ্যে পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া আর বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালে সিনিয়র সার্ভিস পুল বাতিল হয় এবং উপসচিব পদে ৭৫ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডার এবং ২৫ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু হয়। ফলে যে নীতি-পুল হওয়ার কথা ছিল আন্তঃক্যাডার মেধা ও দক্ষতার প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র, সেটি ক্রমে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারকেন্দ্রিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে—এমন অভিযোগ আজও রয়েছে।
এখানে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন, বিষয়টি কোনো ক্যাডারের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদগুলো সরকারের পদ কোনো নির্দিষ্ট ক্যাডারের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। বরং প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে সব ক্যাডারের মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত জ্ঞান যথাযথভাবে কাজে লাগছে কি না।
এই প্রশ্ন পেশাগত ক্যাডারগুলোর ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রকৌশল, প্রাণিসম্পদ, মৎস্যসহ বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একজন শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা জানেন, একজন চিকিৎসক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বোঝেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো বাস্তবায়নের কারিগরি চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অভিজ্ঞ। তাহলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাঁদের অভিজ্ঞতার মূল্য কেন তুলনামূলকভাবে কম হবে?
২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলও আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কিছু ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য সুপার গ্রেড ও বিশেষ গ্রেডের সুযোগ তৈরি হলেও অধিকাংশ ক্যাডারকে তুলনামূলকভাবে নিম্নতর গ্রেডের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ রাখার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক পদকে ৪র্থ গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য ও কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক পদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ ৩য় গ্রেডে রয়েছে। একই মর্যাদা, প্রায় সমপর্যায়ের দায়িত্ব ও দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে এমন পার্থক্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
আরও বড় সমস্যা পদোন্নতি। গুটিকয়েক ক্যাডারে পদোন্নতি তুলনামূলকভাবে নিয়মিত কোথাও কোথাও পদের অতিরিক্ত পদোন্নতির ঘটনাও দেখা যায়। বিপরীতে অধিকাংশ ক্যাডারে পদোন্নতিজট দীর্ঘস্থায়ী। শিক্ষা ক্যাডারে এর প্রকটতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
বর্তমানে প্রশাসনসহ কয়েকটি ক্যাডারের ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ৬ষ্ঠ গ্রেডের সিনিয়র স্কেল অনেক আগেই পেয়েছেন। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম থেকে ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এখনো ৬ষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়মিত পদোন্নতি পাননি। ৩৬তম ব্যাচ চাকরির ৯ বছর এবং ৩৭তম ব্যাচ ৮ বছরে পদার্পণ করেও যদি যথাসময়ে স্বাভাবিক পদোন্নতি না পায়, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয় এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত।
একই সঙ্গে উচ্চতর পদ না থাকা, পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা এবং ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোয় সিলেকশন গ্রেডের সুযোগ বিলুপ্তির ফলে শিক্ষা ক্যাডারসহ বহু ক্যাডারে আর্থিক ও মর্যাদাগত বঞ্চনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের ৪২৯টি অধ্যাপক পদকে তৃতীয় গ্রেড এবং ১৫টি দ্বিতীয় গ্রেডের পদ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনেও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া এবং ৯৮টি অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা সেই সংকটেরই প্রতিফলন।
তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রকৌশল কিংবা অন্য কোনো পেশাগত ক্যাডারকে প্রশাসনিক কাঠামোর অধস্তন কোনো পেশাগত গোষ্ঠী হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিত্যাগ করা জরুরি। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল সাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয় নয় এটি বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বিত প্রয়োগ। সিভিল সার্ভিসের মূল দর্শনও ছিল তাই—বিভিন্ন পেশার দক্ষতাকে একত্র করে রাষ্ট্রকে আরও সক্ষম করা।
কিন্তু যদি একটি ক্যাডার নিজেকে অন্য ক্যাডারের ওপর শ্রেষ্ঠ মনে করে, যদি কোনো ক্যাডারের পদোন্নতি নিয়মিত হয় আর অন্য ক্যাডার বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, যদি একই ধরনের মর্যাদার পদে ভিন্ন গ্রেড নির্ধারণ করা হয়, তবে একীভূত সিভিল সার্ভিসের দর্শন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ বৈষম্য শুধু কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি অসাম্য তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে সেবার মানের ওপরও। মেধাবীরা কোনো ক্যাডারে যেতে অনাগ্রহী হলে, পেশাগত দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে এবং পদোন্নতি ও মর্যাদায় বৈষম্য থাকলে রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিভিল সার্ভিস দিবসে তাই শুধু সরকারি কর্মচারীদের অভিনন্দন জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং নিজেদের আয়নায় দেখার সময় এসেছে। ব্রিটিশ আমলের সিভিল সার্ভিসের মূল লক্ষ্য ছিল শাসন, স্বাধীন বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেবা। যে রাষ্ট্রে জনগণ নাগরিক, সেখানে কর্মকর্তা প্রভু হতে পারেন না। যে সিভিল সার্ভিসে ২৬টি ক্যাডার একীভূত, সেখানে একটি ক্যাডার অন্য ক্যাডারের প্রভু হতে পারে না। আর যে প্রশাসনের মূল লক্ষ্য জনসেবা, সেখানে কোনো পেশার মর্যাদা অন্য পেশার চেয়ে অযৌক্তিকভাবে কম হতে পারে না।
সিভিল সার্ভিসের সরল পাঠ খুব সহজ—রাষ্ট্র জনগণের জন্য আর সিভিল সার্ভিস রাষ্ট্রের হয়ে জনগণের সেবা করবে। কিন্তু সেই সরল পাঠের বাস্তবায়নই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ঔপনিবেশিকতার পোশাক বদলালেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা বদলায় না। তাই আজকে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি মানসিকতার সংস্কারও। প্রয়োজন আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করা, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা, পেশাগত ক্যাডারগুলোর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নীতিনির্ধারণে মাঠপর্যায়ের সব ক্যাডারের যোগ্য কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
সিভিল সার্ভিস দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই—সিভিল সার্ভিসের মর্যাদা ক্ষমতায় নয়, সেবায় শ্রেষ্ঠত্ব আধিপত্যে নয়, দক্ষতায়। আর কর্মকর্তা হওয়ার অর্থ প্রভু হওয়া নয়—জনগণের জন্য দায়িত্বশীল পরিষেবক হওয়া। সরল পাঠটি আমরা সবাই জানি, এখন প্রয়োজন গরল বাস্তবতাকে বদলে সেই পাঠের বাস্তবায়ন।
লেখক পরিচিতি: সৌরভ জাকারিয়া শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও সদস্য, The Edvisors (বাংলাদেশ সিভিল এডুকেশন সার্ভিসবিষয়ক থিংকার্স প্ল্যাটফর্ম)