বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সরকারি চাকরি কেবল জীবিকা নয়, বরং সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। জনবহুল এই দেশে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটের কারণে বিসিএস পরীক্ষা এখন লাখো তরুণের স্বপ্ন ও সংগ্রামের নাম। আমরা যারা দিনরাত এক করে মেধার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হই, আমাদের লক্ষ্য থাকে কেবল একটি সম্মানজনক জীবন। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, বিসিএস এখন আর কেবল মেধার লড়াই নেই; এটি কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, কখনো বা নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের গোলকধাঁধায় বারবার পথ হারাচ্ছে।
বিগত সরকারের সময় কোটা নিয়ে তালবাহানা ও মেধার অবমূল্যায়নের পরিণতি আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেখেছি। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে যেখানে বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। কিন্তু সেই বৈষম্যহীন বাংলাদেশেও পিএসসির (সরকারি কর্ম কমিশন) সাম্প্রতিক কিছু কার্যক্রম আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে ৪৫তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে যে ধরনের অগোছালো ও বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে আমার মনে কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ফলাফল বিভ্রাট ও একই পদে বারবার সুপারিশ
৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর। কিন্তু এই ফলাফলে এমন কিছু ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে যা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত। একই প্রার্থীকে একই ক্যাডারে পুনরায় সুপারিশ করা (রিপিট ক্যাডার), উচ্চতর গ্রেডে কর্মরত প্রার্থীকে নিম্নতর গ্রেডের নন-ক্যাডারে সুপারিশ করা, এমনকি নারী প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত পদে পুরুষ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
আমাদের প্রশ্ন হলো—৪৪তম বিসিএসে 'রিপিট ক্যাডার' জটিলতা নিরসনে যখন ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর বিধিমালা সংশোধন করে সম্পূরক ফল প্রকাশের নজির তৈরি করা হলো, তবে ৪৫তম বিসিএসে কেন তা মানা হবে না? শতাধিক প্রার্থীকে পুনরায় একই পদে সুপারিশ করা কি প্রজাতন্ত্রের শূন্য পদ পূরণে কমিশনের উদাসীনতা নয়? এতে তো কেবল পদের অপচয় হচ্ছে এবং প্রকৃত মেধাবীরা সুযোগ হারাচ্ছেন।
বিধিমালা ও নন-ক্যাডার নিয়োগের দ্বিমুখী নীতি
নন-ক্যাডার নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির আচরণ আমাদের কাছে চরম বৈষম্যমূলক মনে হচ্ছে। ৩৮তম বিসিএসের সময় ফলাফল প্রকাশের আগে কোটা বাতিল হলেও পিএসসি তখন বলেছিল, সার্কুলারে যেহেতু কোটা ছিল তাই কোটা পদ্ধতিতেই ফল হবে। আমরা তখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তা মেনে নিয়েছিলাম। অথচ ৪৫তম বিসিএস সার্কুলারে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, নিয়োগ হবে ২০১০ (সংশোধিত ২০১৪) বিধিমালা অনুযায়ী। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের সময় রহস্যজনকভাবে ২০২৩ সালের নতুন বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে।
এই নতুন বিধিমালা প্রয়োগের ফলে আমরা নন-ক্যাডারে পছন্দক্রম (Choice list) প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। যেখানে ৪৪তম বিসিএসে বারবার পছন্দক্রমের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ৪৫তম বিসিএসের ক্ষেত্রে কেন 'বিশেষ বিবেচনার' দোহাই দিয়ে আমাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে? একই দেশের দুই বিসিএস পরীক্ষার্থীর জন্য আইনের দুই রকম প্রয়োগ কি সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) সরাসরি লঙ্ঘন নয়?
পদ প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা
সবচেয়ে বড় হতাশা এসেছে নন-ক্যাডার পদ প্রত্যাহারের মাধ্যমে। ৪৫তম বিসিএসের মূল বিজ্ঞপ্তিতে ১,০২২টি পদের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু সুপারিশ করা হয়েছে মাত্র ৫৪৫ জনকে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ৪৫৭টি পদ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি ছিল, পদোন্নতির কারণে সরাসরি নিয়োগ সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম, এই পদগুলো প্রত্যাহার করার পরপরই নতুন করে ১১২২টি পদের আলাদা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
একজন বিসিএস প্রার্থী প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা মিলিয়ে ১,৩০০ নম্বরের দীর্ঘ পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার পরও কেন এই বঞ্চনার শিকার হবেন? মাত্র ১০০ নম্বরের আলাদা পরীক্ষার জন্য এই পদগুলো সরিয়ে রাখা কি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা নয়? এই প্রশ্নটি আজ প্রতিটি সংক্ষুব্ধ প্রার্থীর।
আমরা কি ন্যায়বিচার পাব না?
আমরা যারা মেধার পরিচয় দিয়ে মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত এসেছি, আমাদের দাবিগুলো কোনো অন্যায্য আবদার নয়। আমরা চাই—রিপিট ক্যাডার সংশোধন করে সম্পূরক ফল প্রকাশ করা হোক, প্রত্যাহারকৃত ৪৫৭টি পদ ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং আমাদের পুনরায় পছন্দক্রম (Re-choice) প্রদানের সুযোগ দেওয়া হোক।
আমরা সচিবালয় থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর পর্যন্ত আমাদের আরজি জানিয়েছি। কাফন মিছিল ও বিক্ষোভের মতো কর্মসূচি পালন করতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু পিএসসি তার অবস্থানে অনড়। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে যদি এখনো প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা বজায় থাকে, তবে সেই রক্তদান কি বৃথা যাবে না? একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন—আইনের মারপ্যাঁচে আমাদের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করবেন না। আমরা কেবল আমাদের মেধার মর্যাদা ও ন্যায়বিচার চাই।
লেখক:
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক, কোটা সংস্কার আন্দোলন-১৮,
৪৫তম বিসিএস মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থী