একজন চাকরিপ্রার্থীর লেখা

আইন আছে, প্রয়োগ নেই, ৪৭তম বিসিএসে শত শত সাধারণ ক্যাডার পদ খালি থাকার শঙ্কা

জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাডারে ৮ হাজার ৯৯টি পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় মোট শূন্য পদের সংখ্যাও কয়েক লাখ। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন একটি স্বস্তির খবর—বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের সময় আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। ৪৪তম বিসিএসে যেখানে সময় লেগেছিল ৩ বছর ৭ মাস, সেখানে ৪৭তম বিসিএসে মাত্র ১ বছর ৭ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ৫০তম বিসিএসের ফলাফল ১ বছরের মধ্যেই দেওয়া। ফলাফল প্রকাশের এই গতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই দৃশ্যমান গতির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে এক নীরব পদ্ধতিগত সংকট, যা মেধার মূল্যায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে আসিনি; বরং শান্তভাবে একটি কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলতে চাই, যা লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্নকে মাঝপথে থামিয়ে দিচ্ছে।

সমস্যাটি ঠিক কোথায়

এ সংকটের মূল কারণ ‘লোয়ার ক্যাডার চয়েজ’ ও ‘রিপিটেশন’ সমস্যা। একই যোগ্য প্রার্থী যখন একাধিক বিসিএসে ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ পান, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পছন্দের সেরা চাকরিটিতে যোগ দেন। এর ফলে তাঁর চয়েজ লিস্টের নিচের দিকে থাকা তুলনামূলক কম পছন্দের পদগুলো খালি থেকে যায় এবং তিনি সেখানে আর যোগ দেন না।

এতে দুটি বড় ক্ষতি হয়। প্রথমত, মেধাতালিকায় পেছনে থাকা একজন প্রকৃত আগ্রহী প্রার্থী চাকরিটি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। দ্বিতীয়ত, সরকারের বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করে নেওয়া পরীক্ষাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

৪৭তম বিসিএসের প্রার্থীদের হিসাবে, শুধু সাধারণ (জেনারেল) ক্যাডারেই অন্তত ২৫০-এর বেশি এমন প্রার্থী আছেন, যাঁরা আগের বিসিএসেই ভালো পদে কর্মরত অথবা এবার উচ্চতর ক্যাডার পেয়েছেন। ফলে তাঁরা এই বিসিএসের লোয়ার ক্যাডারে আর যোগ দেবেন না। সাধারণ ক্যাডারের মোট ৬৮৭টি পদের মধ্যে যদি ২০০ থেকে ২৫০টি পদ এভাবে নষ্ট হয়, তবে তা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পদের অপচয়। এটি সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনার জন্য একটি বড় ধাক্কা।

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায়

এই পদ অপচয় রোধ করতে সরকার ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর বিসিএস নিয়োগ বিধিমালার ১৭ নম্বর বিধি সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী আগের বিসিএসে একই পদে কর্মরত থাকলে বা যোগ দিতে অনিচ্ছুক হলে তাঁকে নতুন করে সুপারিশ না করার আইনি ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এভাবে খালি হওয়া পদে মেধাতালিকা থেকে পরবর্তী যোগ্য প্রার্থীকে নিয়ে ‘সম্পূরক ফলাফল’ প্রকাশের নিয়মও রয়েছে।

এই নিয়মের সফল নজির কিন্তু আছে। ৪৪তম বিসিএসে এভাবে খালি হওয়া পদ পূরণে সম্পূরক ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রার্থীদের দাবি, ৪৫, ৪৬ কিংবা ৪৭তম বিসিএসে এই নিয়ম নিয়মিত অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলাফল দেওয়ার গতি বাড়লেও সম্পূরক ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে সেই গতি দেখা যাচ্ছে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নন-ক্যাডার পদের তীব্র সংকট। আগে ক্যাডার না পেলেও অনেকে নন-ক্যাডারে চাকরি পেতেন। ৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদ ছিল ৪ হাজার ১৩৬টি। অথচ ৪৭তম বিসিএসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০১টিতে। ফলে বঞ্চিত প্রার্থীদের বিকল্প পথটিও এখন বন্ধ।

এই জটিলতা থেকে বের হতে ৫টি প্রস্তাব হতে পারে এমন—

১. তথ্য যাচাই: চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই প্রার্থীর আগের ক্যাডারের তথ্য যাচাই করা হোক।

২. অনলাইন ঘোষণা: গেজেটের আগে বা পরে গুগল ফর্মের মাধ্যমে জেনে নেওয়া হোক কারা লোয়ার ক্যাডারে যোগ দিতে চান না।

৩. সম্পূরক ফলাফল: বিধি ১৭ প্রয়োগ করে অনধিক ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরবর্তী যোগ্যদের তালিকা প্রকাশ করা হোক।

৪. তথ্য প্রকাশ: প্রতিটি বিসিএসে কতজন যোগ দিলেন আর কতটি পদ খালি থাকল, তা স্পষ্টভাবে আলাদা করে প্রকাশ করা হোক।

৫. কর্মসংস্থান রক্ষা: সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মপরিকল্পনা সফল করতে ৪৭তম বিসিএস থেকেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক।

শুধু দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করাই একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ার মূল সাফল্য হতে পারে না। আসল সাফল্য তখনই আসবে, যখন অনুমোদিত প্রতিটি শূন্য পদে একজন যোগ্য তরুণ বাস্তবে যোগদান করতে পারবেন। লোয়ার ক্যাডার সমস্যার সমাধান এবং সম্পূরক ফলাফল নিয়মিত করা না গেলে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ও লাখো তরুণের মেধা—দুই-ই অপচয় হতে থাকবে।

*লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক