কাগজে-কলমে ঢাকার করপোরেট অফিসগুলোর সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। কিন্তু ডিজিটাল ওভারলোড এবং সার্বক্ষণিক ‘কানেক্টেড’ থাকার বাধ্যবাধকতা এই সময়সীমাকে বিলুপ্ত করেছে। বিকেল পাঁচটার অফিস এখন ড্রয়িংরুম ছাড়িয়ে মানুষের মগজে স্থায়ী নোঙর ফেলেছে। ২০২৬ সালের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারফরম্যান্সের চাপ এবং ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে একবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে ঠেকেছে। একটি ক্যাফেতে বসা তিন চেনা করপোরেট চরিত্রের বাস্তব যাপন ও মানসিক সংকট বিশ্লেষণ করলে এই অদৃশ্য ক্ষতগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অনিকের গল্প: ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল দাসত্ব ও ‘অ্যাংজাইটি’—
অনিক (ছদ্ম নাম) একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের টিম লিডার। বয়স মাত্র আটাশ হলেও কাজের অতিরিক্ত চাপ ও সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে তিনি এখন তীব্র উদ্বেগের রোগী। ল্যাপটপ বন্ধ করার পরও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের চাপ তাঁর পিছু ছাড়ে না। অনিকের ভাষায়, ‘অফিস নাকি বিকেল পাঁচটায় শেষ হয়! কিন্তু রাত দুইটাতেও ফোন শান্ত থাকে না। বসের একটা হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন মানেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠা।’
অনিকের এই যাপন আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক চিকিৎসক সরদার আতিকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনিকের এই সংকটের গভীরতাকে নিশ্চিত করে। সরদার আতিক বলেন, ‘অফিস টাইমের পরও অফিশিয়াল যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকার এই মানসিক চাপ তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ এবং অনিদ্রার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দ্রুত এমন এক কর্মপরিববেশ ও গাইডলাইন তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন কর্মী নির্ভয়ে বলতে পারবেন, ‘আমি মানসিক চাপে আছি, আমার ছুটি প্রয়োজন।’
দিবার গল্প: কর্মজীবী মায়েদের ওপর দ্বিগুণ চাপ—
দিবা (ছদ্ম নাম) একটি বেসরকারি ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা, যিনি সম্প্রতি মা হয়েছেন। করপোরেট দুনিয়ায় মেয়েদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জটিল। ফ্লেক্সিবল আওয়ারের মতো কিছু সুযোগ খাতা-কলমে থাকলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্র এখনো সহানুভূতিহীন।
দিবা জানান, ‘সবাই মুখে প্রসূতিকল্যাণ আর নমনীয়তার কথা বলে। কিন্তু মা হওয়ার পর প্রতিদিনের লড়াইটা যে কত নিঃসঙ্গ, তা কেউ বোঝে না। সন্তানের তদারকি শেষে রাতে না ঘুমিয়ে ঠিক সকাল ৯টায় অফিসে পাঞ্চ করতে হয়। কাজের সামান্য কমবেশি হলেই দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।’ দিবার মতো কর্মজীবী মায়েরা প্রতিনিয়ত ‘সুপারওম্যান’ হওয়ার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের শিকার, যা তাদের দ্রুত ‘বার্নআউট’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাঁধনের গল্প: চাকরি হারানোর আতঙ্ক ও নীরবতার সংস্কৃতি—
বেসরকারি শিক্ষা খাতে কর্মরত বাঁধন (ছদ্ম নাম) অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি মূলত সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর অংশ, যাঁরা ছাঁটাইয়ের ভয় এবং সামাজিক মর্যাদার কারণে কর্মক্ষেত্রের মানসিক নিপীড়ন মুখ বুজে সহ্য করেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় নকরি ডট কম-এর একটি সাম্প্রতিক জরিপ (যা প্রায় ২০ হাজার পেশাজীবীর ওপর চালানো হয়েছে) দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ কর্মী মানসিক অবসাদে ভুগলেও এ–সংক্রান্ত ছুটি চাইতে ভয় পান। বাঁধন এই নীরব ৭৫ শতাংশেরই একজন প্রতিনিধি। আমাদের দেশে ‘মানসিক চাপ’ প্রকাশ করাকে এখনো পেশাগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। চাকরি হারানোর ভয় আর সমাজ কী বলবে—এই দুই চাপে বাঁধনের মতো সৃজনশীল যুবকেরা প্রতিনিয়ত ভেতরে–ভেতরে ভেঙে পড়ছেন।
নৈতিক দায়িত্ব নাকি স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট?—
২০২৬ সালে এসেও আমাদের করপোরেট কালচার এখনো আউটপুট ও এফিশিয়েন্সির পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে। কিন্তু গ্লোবাল ওয়েলনেস ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, যে প্রতিষ্ঠান কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং অনুপস্থিতির হার কমে।
আমাদের দেশের করপোরেট হোমরাচোমরাদের মনে রাখা উচিত, মানসিক স্বাস্থ্যের পেছনে নজর দেওয়াটা কোনো দয়া বা করপোরেট অনুকম্পা নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীভাবে টিকে থাকার একটি জুতসই কৌশল। নীতিনির্ধারক ও ব্যবস্থাপকদের বুঝতে হবে, কর্মীরা কোনো যন্ত্র বা স্রেফ ‘রিসোর্স’ নন, তাঁরা মানুষ। করপোরেট লিডারশিপ যত দ্রুত মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাকে তাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি বানাবে, দেশের পেশাজীবী খাত ততই সুদৃঢ় হবে।