সেপ্টেম্বরে চাকরির বাজার কেমন ছিল, সামনে কী

সেপ্টেম্বরে চাকরির বাজারে বড় পরিবর্তন আসেনি, তবে কয়েকটি বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কর্মসংস্থান খাতকে সরব রেখেছে। সরকারি খাতে একদিকে ৫১তম বিশেষ বিসিএসে ৫ হাজার পদ, অন্যদিকে পেট্রোবাংলায় ৭৫৩ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ২৩৪ পদসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে। বেসরকারি খাতেও সেলস, ব্যাংক, এনজিও ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজে নিয়োগ দেখা গেছে। সামনে সাধারণ বিসিএসের নতুন বিজ্ঞপ্তিও আসার কথা।

বড় নিয়োগে সরকারি খাত

সেপ্টেম্বরে সরকারি চাকরির বাজারের সবচেয়ে বড় ঘটনা ৫১তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি। ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৫ হাজার পদের এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর মধ্যে সহকারী সার্জন ৪ হাজার ৭০০ এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন ৩০০ পদ। ৩০ সেপ্টেম্বর এই বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসও প্রকাশ করেছে পিএসসি।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আসে আরেকটি বড় নিয়োগ। পেট্রোবাংলা ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোতে ১৯ ক্যাটাগরিতে ৭৫৩ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রকৌশল, জিওলজি, জিওফিজিকস, কেমিস্ট্রি, চিকিৎসা, অর্থসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পদ রয়েছে। আবেদন শুরু হবে ১৮ অক্টোবর, শেষ হবে ১৭ নভেম্বর।

এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের উল্লেখযোগ্য সরকারি নিয়োগের মধ্যে ছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ৫৩৮ পদ। এর মধ্যে অফিস সহায়ক ৫০৬ এবং সিমেন ক্যারিয়ার ৩২ পদ। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় ১০ সেপ্টেম্বর। আবেদন শেষ ৬ অক্টোবর।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে ৩৪ ক্যাটাগরিতে ৩০১ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে। আবেদন শুরু হয় ২১ সেপ্টেম্বর। শেষ হবে ১১ অক্টোবর।

বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় ১৪২ পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন ১১২ পদেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এসেছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। শুধু ১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর সপ্তাহেই প্রথম আলোর হিসাবে ১০টি বড় সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ৫৪৪টির বেশি পদ ছিল।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে যাচাই করা বড় সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোতে ৭ হাজারের বেশি পদ পাওয়া যায়। তবে এটি সব সরকারি নিয়োগের চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। কারণ, সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তির কোনো একক মাসভিত্তিক কেন্দ্রীয় হিসাব নেই; বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়। জাতীয় তথ্য বাতায়নেও সরকারি নিয়োগের তালিকা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়।

বেসরকারি খাতে সেলসের চাহিদা বেশি—

বেসরকারি চাকরির বাজারে সেপ্টেম্বরের বড় প্রবণতা ছিল সেলস ও মাঠপর্যায়ের কাজে নিয়োগ। আড়ং ৫০০ জন সেলস অ্যাসোসিয়েট নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এই নিয়োগে এইচএসসি পাস প্রার্থীরাও আবেদন করতে পারেন। কর্মস্থল হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলার কথা বলা হয়েছে। আবেদনের শেষ তারিখ ২০ অক্টোবর।

সেলসের সঙ্গে খুচরা বিক্রি ও ভোক্তা পণ্যের ব্যবসাতেও বড় নিয়োগ দেখা গেছে।

এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থার নিয়োগও সেপ্টেম্বরে উল্লেখযোগ্য ছিল। ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) ৯ ক্যাটাগরিতে ৬৯৩ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এসকেএস ফাউন্ডেশন ৭ ক্যাটাগরিতে ২৭৭ জন এবং সিএসএস ১৫০ জন লোন অফিসার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

সরকারি খাতের মতো বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তির কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মাসিক হিসাব নেই। তাই সেপ্টেম্বরের প্রকাশিত বড় বিজ্ঞপ্তিগুলো শ্রেণিবিন্যাস করলে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে সেলস, বিপণন ও মাঠপর্যায়ের কাজের পাশাপাশি এনজিও, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষায়িত পদে নিয়োগ সক্রিয় ছিল।

ব্যাংক খাতের চিত্রও ছিল বৈচিত্র্যময়। সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে প্রবেশনারি ও ট্রেইনি অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সাব-ব্রাঞ্চ ইনচার্জসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২২০টি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। আবেদনের শেষ তারিখ ১৮ অক্টোবর।

অন্যদিকে বিশেষায়িত দক্ষতার চাকরিও কমেনি। পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনে (পিকেএসএফ) সফটওয়্যার প্রকৌশলী, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার, ডেটা আর্কিটেক্টসহ সাত ক্যাটাগরিতে ২৭ জন নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি ছিল। পদভেদে বেতন ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর।

অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের বেসরকারি চাকরির বাজারে একটি দিক ছিল বড় সংখ্যায় কর্মী নেওয়া—বিশেষ করে সেলস, ফিল্ড ও বেসরকারি সংস্থার কাজে। অন্যদিকে তুলনামূলক কমসংখ্যক হলেও উচ্চ দক্ষতার প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও ব্যবস্থাপনা পদে বেতন ও যোগ্যতার চাহিদা ছিল বেশি।

সেপ্টেম্বরের পর কোথায় যাবে চাকরির বাজার

সেপ্টেম্বরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলো দেখে সামনে চাকরির বাজারে দুটি সমান্তরাল ধারা দেখা যাচ্ছে। সরকারি খাতে বড় নিয়োগের পাশাপাশি বিসিএসকেন্দ্রিক নিয়োগ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসছে। আর বেসরকারি খাতে সেলস, সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত দক্ষতার কাজের চাহিদা বজায় রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে ৫২তম সাধারণ বিসিএস নিয়ে। পিএসসির পূর্বঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর মাসে সাধারণ বিসিএসের নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা সম্প্রতি শেষ হয়েছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী নভেম্বরের মধ্যেই ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং এরপর নতুন সাধারণ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা রয়েছে।

ফলে সেপ্টেম্বরের ৫১তম বিশেষ বিসিএসের পর সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের সামনে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আরেকটি বড় বিসিএসের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ৫২তম বিসিএসে কত পদ থাকবে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি।

সেপ্টেম্বরের আরেকটি দিক হলো, নিয়োগ শুধু স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে সীমিত ছিল না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ৫০৬টি অফিস সহায়ক পদে এসএসসি পাস প্রার্থীর সুযোগ ছিল। আড়ংয়ের ৫০০ সেলস অ্যাসোসিয়েট পদেও এইচএসসি পাস প্রার্থীরা আবেদন করতে পারছেন। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি দুই খাতেই শিক্ষাগত যোগ্যতার নিচের স্তরের প্রার্থীদের জন্য বড় সংখ্যার কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অক্টোবর ও নভেম্বরের বাজারে তাই সরকারি চাকরির বড় বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি বেসরকারি খাতে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক নিয়োগের দিকে নজর থাকবে। আর ৫২তম সাধারণ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে সরকারি চাকরির বাজারে সেপ্টেম্বরের তুলনায় নতুন করে বড় ঢেউ আসতে পারে।