কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ ঘটছে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজার খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত পাল্টাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। পেশাদারদের বৈশ্বিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ‘ট্যালেন্ট রিপোর্ট’-এ চাকরির বাজারের এই নতুন বাস্তবতার তথ্য উঠে এসেছে।
লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সঠিক সময়ে তাদের কর্মীদের নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে পারছে না। একে বলা হচ্ছে ‘ট্যালেন্ট ভেলোসিটি’ বা দক্ষতার গতিশীলতার ঘাটতি। ফলে বাজার বা প্রযুক্তির চাহিদা অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে পড়ছে। মাত্র ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। তারা প্রযুক্তির এই নতুন যুগে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।
ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের গতিপ্রকৃতি
লিংকডইনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে আগামী দিনের বৈশ্বিক ও দেশীয় চাকরির বাজারে প্রধান কয়েকটি পরিবর্তনের রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে-
প্রথাগত চাকরির বদলে ‘নিউ-কলার’ কাজের সুযোগ
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি দেখে এখন আর চাকরি মিলছে না। কারিগরি জ্ঞান, কাজের দক্ষতা ও নতুন প্রযুক্তি শেখার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে ‘নিউ-কলার’ চাকরির ক্ষেত্র। গত দুই বছরে বিশ্বজুড়ে ডেটা অ্যানোটেটর ও এআই ইঞ্জিনিয়ারের মতো অন্তত ১৩ লাখের বেশি এআই-সংক্রান্ত নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
কর্মী ধরে রাখতে নতুন কৌশল
বিশ্বজুড়ে ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সময়মতো সঠিক কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে চিন্তিত। আবার ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী ধরে রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছে। তাই কর্মী ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কাজের ফাঁকে শেখার সুযোগ বাড়াচ্ছেন। এর পাশাপাশি জ্যেষ্ঠদের পরামর্শ প্রদান এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নতুন পদে স্থানান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করছেন।
প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয়
ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে শুধু প্রযুক্তিগত বা এআই দক্ষতা জানলে চলবে না। প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের নিজস্ব মেধা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও নমনীয় মানসিকতার কদর বাড়বে।
লিংকডইনের এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের কর্মসংস্থান খাত ও বেকার তরুণদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আমাদের দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে আসছেন। কিন্তু বাস্তব কাজের উপযোগী প্রযুক্তিগত দক্ষতা না থাকায় তাঁদের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের মুখে পড়ছে। নির্দিষ্ট প্রথাগত চাকরির প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর সময় পার করার কারণে তরুণেরা এই পরিবর্তনের যুগে আরও পিছিয়ে পড়ছেন।
পেশা বিশেষঙ্গদের মতে, বাংলাদেশে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে বর্তমান শিক্ষাক্রমকে প্রযুক্তিমুখী করতে হবে। তরুণদের কেবল কাগজের ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে কারিগরি, এআই, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কাজে দক্ষ হতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের কর্মীদের এআই ও নতুন প্রযুক্তির উপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে যত দ্রুত নতুন দক্ষতা শিখবেন, চাকরির বাজারে তাঁর কাজের সুযোগ তত বেশি বাড়বে।