আপনি কাজের মূল্যায়নের জন্য বেতন বাড়ানোর কথা বলবেন, অন্য কোনো কারণে বেতন বাড়াতে হবে, তা নয়
আপনি কাজের মূল্যায়নের জন্য বেতন বাড়ানোর কথা বলবেন, অন্য কোনো কারণে বেতন বাড়াতে হবে, তা নয়

চাকরিতে বেতন বাড়াতে আসলে কী করতে হবে

মাসের ২৭ তারিখ। রাকিবের ( ছদ্মনাম) মোবাইলে বেতনের বার্তা এল—৬০ হাজার টাকা। খুদে বার্তাটি দেখে তাঁর মন খারাপ হলো না, আবার খুব খুশিও হলেন না। কারণ, তিন বছর ধরে এই অঙ্কটি প্রায় একই জায়গায় থমকে আছে।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় বেতন ছিল ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা। তিন বছরে বেড়েছে মাত্র সাড়ে তিন হাজার। কিন্তু এই সময়ে বাজারের হিসাব বদলে গেছে, বাসাভাড়া লাফিয়ে বেড়েছে, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, এমনকি প্রতিদিনের এক কাপ কফির দামও প্রায় ডাবল হয়ে গেছে। শুধু রাকিবের বেতনটি যেন অফিসের সেই পুরোনো লিফট—চলছে ঠিকই, কিন্তু এগোচ্ছে না।

বন্ধুরা রাকিবকে প্রায়ই পরামর্শ দেন, ‘চাকরি বদলাও।’ কিন্তু রাকিবের প্রশ্ন, ‘নতুন জায়গায় গেলেই কি বেতন এক লাখ টাকা হবে?’

সেখানেই আসল গল্প। ৬০ হাজার থেকে বেতন ১ লাখে নেওয়া মানে শুধু ৪০ হাজার টাকা বাড়ানো নয়; এর অর্থ হলো নিজের বাজারমূল্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।

কঠোর পরিশ্রম বনাম কাজের সঠিক প্রভাব

অফিসে অনুগত বা ভালো কর্মী হওয়া আর বেশি বেতন পাওয়া এক বিষয় নয়। আপনি সময়মতো অফিসে আসেন, ফাইল সামলান, বস যা বলেন, তা হাসিমুখে করেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে চমৎকার ব্যবহার করেন। এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠান আপনাকে কেন অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা দেবে?

ক্যারিয়ার–বিশেষজ্ঞ শো ডিওয়ান ২০২৬ সালের মে মাসে ‘ফোর্বস’–এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, শুধু সময় গুনে বা পরিশ্রম করে বেতন বাড়ানো যায় না। কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের কাছে নির্ভরযোগ্য এবং প্রত্যক্ষ ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তা প্রমাণ করতে হয়।

তাই রাকিবের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজের কাজের হিসাব করা। বসকে গিয়ে ‘সারা দিন অনেক কাজ করি’ না বলে তথ্যের মাধ্যমে বলতে হবে, ‘গত এক বছরে আমার কাজের কারণে প্রতিষ্ঠানের এই পরিমাণ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বা রাজস্ব বেড়েছে।’

চাকরির বাজারে আপনার সত্যিকারের দাম জানুন

নিজের পদের বাজারদর না জেনে বেতন বাড়ানোর কথা বলা আর চোখ বন্ধ করে বাজারে কেনাকাটা করা একই কথা।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত হার্ভার্ড ল স্কুলের ‘প্রোগ্রাম অন নেগোশিয়েশন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেতন নিয়ে আলোচনার আগে বাজারের প্রচলিত তথ্য, নিজের অবদান এবং প্রতিষ্ঠানের বর্তমান লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। সেখানে নিজের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক খরচের কথা না তুলে ধরে কাজের আসল মূল্য তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, বসকে গিয়ে ‘স্যার, বাজারে সবকিছুর দাম দ্বিগুণ’ বলার চেয়ে বলা উচিত—‘স্যার, গত এক বছরে আমি এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছি, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স এত শতাংশ বেড়েছে।’

প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত দক্ষতার সংযোজন

রাকিব এবার তাঁর দক্ষতার তালিকা তৈরি করলেন। দেখলেন, তিন বছর ধরে তিনি ঠিক একই কাজ করে যাচ্ছেন, নতুন কিছুই শেখেননি। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত পেশাদারদের প্ল্যাটফর্ম লিংকডইনের ২৪ লাখ কর্মীর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মীদের বিশেষায়িত দক্ষতা বেশি বেতনের পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি বহুবিধ দক্ষতার বিকাশ নতুন পেশায় পদার্পণ সহজ করে তোলে। তাই বর্তমান সময়ে বেশি সময় ধরে কাজ করলেই হবে না; বরং প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, এমন নতুন কাজ শিখতে হবে।

বিপণন খাতে থাকলে ডেটা অ্যানালিটিকস, হিসাব শাখায় থাকলে আধুনিক ফাইন্যান্সিয়াল সফটওয়্যার, কিংবা লেখালেখির ক্ষেত্রে এআই (AI) প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার জানা থাকতে হবে। এই বিশেষ দক্ষতাটিই তাঁকে সহকর্মীদের থেকে আলাদা করবে।

দর-কষাকষির সঠিক কৌশল

অনেকে বসের কাছে গিয়ে বেতন বাড়ানোর কথা বলতে ভয় পান। কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে এই আলোচনা সহজ হয়ে যায়। হার্ভার্ডের ‘প্রোগ্রাম অন নেগোশিয়েশন’ (জুলাই ২০২৬)-এর মতে, বেতন আলোচনায় শুধু মূল টাকা নয়; নতুন দায়িত্ব, পদোন্নতির রূপরেখা এবং কাজের নমনীয়তাকেও যুক্ত করা যায়। আর ফোর্বসের ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে আরও চমকপ্রদ তথ্য এসেছে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে মাত্র ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ নতুন কর্মী বেতন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে ভালো প্রস্তাব পেয়েছেন।

চাকরি বদল নাকি দক্ষতা বৃদ্ধি?

বেতন বাড়াতে চাকরি বদলানো হলো শেষ অস্ত্র। তবে শুধু ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পাওয়ার জন্য হুট করে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নতুন প্রতিষ্ঠানে শেখার সুযোগ কতটা, এক বছর পর সেখানে আপনার বাজারমূল্য কতটুকু বাড়বে, তা ভেবে দেখা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণদের হিসাবটা তাই খুব পরিষ্কার:

–আজ বেতন ৬০ হাজার? আগামী ৬ মাসে একটি দামি দক্ষতা অর্জন করুন।

–নিজের কাজের প্রভাব ও ফলাফলের একটি ফাইল প্রস্তুত করুন।

–বাজারের সাম্প্রতিক তথ্য জেনে প্রস্তুত হয়ে বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন।

মনে রাখবেন, বেতন বাড়াতে সব সময় চাকরি বদলাতে হয় না। নিজের কাজের দাম বাড়াতে পারলে একই অফিসে বেতন বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত হিসাবটা খুব সহজ—আপনি যত বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবেন, আপনার বেতন বাড়ানোর কারণও তত যৌক্তিক হবে।