প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সভা, সেমিনারে শিক্ষকের মর্যাদা ও জাতি গঠনে তাঁদের অবদানের কথা সাতকাহন করে উচ্চারিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকের ছবি দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বক্তৃতার মঞ্চে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা শিক্ষককে বলেন জাতি গঠনের কারিগর, আলোকবর্তিকা, সভ্যতার নির্মাতা।
তারপর?
শিক্ষক দিবস চলে যায়, আলোচনাও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। শিক্ষকের জীবনে থেকে যায় সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই: সর্বোচ্চ কোনো গ্রেডে যেতে পারেন, পদোন্নতি কবে, ভ্যাকেশন বিভাগ থেকে মুক্তি কি আদৌ মিলবে, গবেষণার সুযোগ কোথায়, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা কোথায়, আর রাষ্ট্রীয় মর্যাদার বাস্তব প্রতিফলনই–বা কোথায়?
শ্রদ্ধা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি নির্মম সত্য আমাদের স্বীকার করতে হবে: সম্মান দিয়ে সংসারের বাজার করা যায় না। মর্যাদার সনদ দিয়ে সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটানো যায় না। বক্তৃতায় শিক্ষককে জাতির কারিগর বললে তাঁর পদোন্নতির ফাইলও এগোয় না। শিক্ষকের মর্যাদা তাই শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়। তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলে রাষ্ট্রের বেতনকাঠামো, পদোন্নতি ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা, গবেষণা বরাদ্দ, কর্মপরিবেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বোঝার সবচেয়ে নির্মোহ উপায় তার বাজেট ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে তাকানো।
যে রাষ্ট্র উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সুবিধা কিংবা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে পারে, শিক্ষকের ন্যায্য আর্থিক সুবিধার প্রশ্নে সেই রাষ্ট্রের মুখেই প্রায়ই অর্থসংকটের কথা শোনা যায়। এখানেই প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে: রাষ্ট্র কি সত্যিই দরিদ্র, নাকি শিক্ষকের বেলায় এসে তার সামর্থ্য সীমিত হয়ে পড়ে?
নির্বাচনের প্রাক্কালে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য প্রায় কোটি টাকা মূল্যের নতুন মডেলের গাড়ি কেনা হয়েছে। অথচ তখন দেশে ডলার-সংকট, মূল্যস্ফীতি চরমে, বিদ্যুৎ ও সারের জন্য নগদ অর্থ জোগাতে না পেরে সরকারকে বন্ড ছাড়তে হয়েছিল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানির অর্থও বকেয়া ছিল। প্রজাতন্ত্রের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা যখন পদোন্নতি, ভাতা ও বিদেশ সফরের সুযোগ পান, তখন রাষ্ট্র থাকে উদার। শুধু শিক্ষকদের বেলায় রাষ্ট্র যেন হঠাৎ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পদোন্নতির বাজেট থাকে না, শিখন উপকরণের জোগান নেই, গৃহঋণের বরাদ্দ অপ্রতুল, প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ মেলে না, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সীমিত সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়, আর মর্যাদার ন্যূনতম স্বীকৃতি নীতিবাক্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এবার ব্যাংক খাতের দিকে তাকানো যাক। সোনালী ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ১৮ হাজার ১৬৭ জন, জনতা ব্যাংকে ১৪ হাজার ৩২৩ এবং অগ্রণী ব্যাংকে ১০ হাজার ৬৭৭ জন। এসব ব্যাংকের কর্মীরা বছরে পাঁচটি বোনাস, তিনটি ইনসেনটিভ ও দুটি উৎসবভাতা, প্রতিদিন দুপুরে ৪০০ টাকা লাঞ্চ ভাতা, গৃহঋণ, গাড়ি ক্রয়ের সুবিধা এবং আরও নানা আর্থিক সুযোগ পান। প্রশ্ন হলো, এই ব্যয় যদি ব্যাংকগুলো বহন করতে পারে, তবে সেই একই রাষ্ট্র স্নাতকোত্তর স্তর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য কেন ব্যয় করতে পারে না? শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সময়মতো পদোন্নতি, গ্রেড ও মর্যাদা দিতে পারে না কেন?
এই প্রশ্ন কোনো একটি সরকারকে উদ্দেশ করে নয়। সরকার আসে, সরকার যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে, নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলায়। কিন্তু শিক্ষকদের পদোন্নতির জট, নিম্ন আর্থিক সুবিধা ও মর্যাদাগত বৈষম্যের অনেকগুলো সমস্যা সরকার পরিবর্তনের পরও অটুট থাকে। অর্থাৎ বিষয়টি ব্যক্তিবিশেষের ব্যর্থতার চেয়ে বড়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকই শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিনিধি। অথচ তাঁদের কর্মজীবনের বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে এমন যে বহু শিক্ষক বছরের পর বছর একই পদে থেকে অবসর নেন। পদোন্নতির সিঁড়ি যেখানে অন্য কর্মচারীর কর্মজীবনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়, সেখানে অনেক প্রাথমিক শিক্ষককে প্রায় একই পদে থেকে পুরো কর্মজীবন কাটাতে হয়। প্রধান শিক্ষক হতে পারাই অনেকের জন্য একমাত্র উল্লেখযোগ্য পদোন্নতির সুযোগ। একজন শিক্ষক পঁচিশ বা ত্রিশ বছর চাকরি করেও যদি জানতে না পারেন তাঁর পরবর্তী পদোন্নতি কবে, তবে সেই অনিশ্চয়তা কেবল ব্যক্তিগত হতাশাই তৈরি করে না, শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকেও দুর্বল করে।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের অবস্থাও খুব ভিন্ন নয়। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের পদোন্নতির পথ দীর্ঘ ও সংকীর্ণ। অল্পসংখ্যক শিক্ষক সহকারী প্রধান শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান। আরও অল্পসংখ্যক দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে উচ্চতর গ্রেডে পৌঁছাতে পারেন। অন্যদিকে শহরের অধিকাংশ এমপিওভুক্ত কলেজের শিক্ষকেরা, বিশেষ করে বিভিন্ন বাহিনী পরিচালিত কলেজের শিক্ষকেরা, ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতার সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ থেকে ৩০ শতাংশ সিটি অ্যালাউন্স বা অন্য ভাতা পেয়ে তুলনামূলক বেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি ও এমপিওভুক্ত কলেজের শিক্ষকেরা অনেকাংশেই বঞ্চিত ছিলেন। মূল বেতনের মাত্র ২০ শতাংশ বাড়িভাতার জন্য তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে, তাঁরা পেতেন মাত্র ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া ভাতা ও ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা একসময় মূল বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পেতেন, ধীরে ধীরে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং এখন ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে। এই অগ্রগতি প্রশংসনীয়। এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, কিন্তু এগুলোকে বিচ্ছিন্ন সুবিধা হিসেবে না দেখে শিক্ষকতার সামগ্রিক পারিশ্রমিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা, নৈতিকতা ও নাগরিকত্ব শেখান, তখন তাঁর নিজের জীবন যদি ক্রমাগত আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে, সেটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। সেটি রাষ্ট্রীয় নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও সরকারি কলেজের শিক্ষকদের অবস্থা এককথায় বলতে গেলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কুবেরের কথা মনে পড়ে। এই ক্যাডারের বর্তমান অবস্থা সঠিকভাবে চিত্রিত করতে ‘গরিবের মধ্যে সে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক’ এই লাইনটিই যথেষ্ট। উচ্চশিক্ষা ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সরাসরি পাঠদানের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দপ্তরে কাজ করার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা প্রশাসনকে কার্যকর ও যুগোপযোগী করার উদ্দেশ্যেই শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো শিক্ষা ক্যাডারের শিডিউলভুক্ত করা হয়েছিল। বিসিএস (জেনারেল এডুকেশন) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস, ১৯৮০ অনুযায়ী প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সব শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্যাডার পদ শিক্ষা ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত।
অথচ গত চার দশকে কারিগরি, প্রাথমিক, ব্যানবেইস, এনটিআরসিএ, মাদ্রাসা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের সরিয়ে সেখানে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাবিহীন কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে। ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের তৃতীয় গ্রেডে যাওয়ার যে সুযোগ ছিল, ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে তাঁদের চতুর্থ গ্রেডে আটকে দেওয়া হয়েছে, পদসোপানে তৃতীয় ও দ্বিতীয় গ্রেডের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ২৪ থেকে ৩৮তম ব্যাচ পর্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং পদস্বল্পতা নিরসনে সুপারনিউমারারি পদ সৃজনও অজানা কারণে স্থবির হয়ে আছে। মোদ্দাকথা, নানাবিধ সমস্যার গহ্বরে ফেলে ক্যাডারটিকে চল্লিশ বছর ধরে বনসাই করে রাখা হয়েছে।
একই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে, একই রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার অধীনে, একই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অতিক্রম করে বিভিন্ন ক্যাডারে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের গতি যদি এতটা ভিন্ন হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের সেরা সময় ব্যয় হওয়ার কথা গবেষণা, পাঠদান, শিক্ষার্থী গঠন ও জ্ঞানচর্চায়। পদোন্নতির ফাইল, জ্যেষ্ঠতার তালিকা, পদসংকট ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় সেই সময় ক্ষয় হওয়া রাষ্ট্রেরও ক্ষতি।
দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ হাজার ৮০৫ জন শিক্ষকের প্রত্যেকের কর্মজীবনে গ্রেড-১-এ পৌঁছানোর সুযোগ থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা গ্রেড-২ ও ৩ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষকদের মধ্যে পদোন্নতির দিক থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও নানা বৈষম্য ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাঁরা এখনো গাড়ি-সুবিধাবঞ্চিত, অথচ পঞ্চম থেকে প্রথম গ্রেডের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা গাড়ি-সুবিধা থেকে বাবুর্চি-সুবিধা পর্যন্ত পান। এমনকি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও গাড়ির সুবিধা উপভোগ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠদানকারী অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান এমনকি কলেজের অধ্যক্ষদের জন্যও কোনো গাড়ি বরাদ্দ নেই। প্রবাদে আছে, ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে।’ অথচ যিনি লেখাপড়া করান, তাঁর ভাগ্যে গাড়ি-ঘোড়া জোটে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সরকারি কলেজের শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষক, উভয়েই উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের দায়িত্বের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের জ্ঞানব্যবস্থায় তাঁদের ভূমিকা পরস্পর সম্পর্কিত।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেবল বেতন গ্রেড দিয়ে নির্ধারিত হয় না। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রটোকলও একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। বাংলাদেশের প্রচলিত ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সচিবদের অবস্থান জাতীয় অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের চেয়ে উঁচুতে রাখা হয়েছে। সরকারি তালিকায় সচিবেরা ১৬ নম্বর ক্রমে এবং জাতীয় অধ্যাপকসহ সংশ্লিষ্ট কিছু পদ ১৭ নম্বর ক্রমে রয়েছে। এটি নিছক তালিকার ক্রম নয়, রাষ্ট্র তার বিভিন্ন পেশা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি কেমন আনুষ্ঠানিক মর্যাদা আরোপ করছে, এটি তারও প্রতীকী প্রকাশ। অবশ্য প্রটোকলের ক্রমকে সরাসরি ব্যক্তিগত মর্যাদার পরিমাপক বলা ঠিক হবে না। কিন্তু শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্র যখন এত কথা বলে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, বেতনকাঠামো ও ক্যারিয়ার ব্যবস্থার মধ্যেও সেই মর্যাদার সামঞ্জস্য প্রত্যাশিত।
আমরা যখন ব্লেন্ডেড লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা বলি, তখন একটি সাধারণ প্রশ্ন করা দরকার: শিক্ষকের হাতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কোথায়? একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজের জন্য সরকারি প্রযুক্তি সহায়তা যদি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়, তাহলে একজন শিক্ষক কেন ডিজিটাল শিক্ষা দেবেন নিজের ব্যক্তিগত ডিভাইস ও নিজের ইন্টারনেট খরচে? ডিজিটাল রূপান্তর কেবল শিক্ষার্থীর হাতে ডিভাইস তুলে দেওয়ার নাম নয়। শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, ডিভাইস, ইন্টারনেট, সফটওয়্যার, গবেষণা সহায়তা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো দিতে হবে। নাহলে আমরা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার কথা বলব, কিন্তু প্রযুক্তির ব্যয়ভার বহন করবেন শিক্ষক নিজেই।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুধু পরীক্ষা নেওয়া নয়, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। অথচ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গবেষণা অর্থায়ন দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রতুল। একদিকে রাষ্ট্র জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলছে, অন্যদিকে জ্ঞান সৃষ্টির মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা সক্ষমতা যদি দুর্বল থাকে, তাহলে সেই অর্থনীতি গড়ে উঠবে কীভাবে?
একই গ্রেডের অন্য চাকরিজীবীর, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের, সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার তুলনা করলে বৈষম্যের একটি দিক স্পষ্ট হয়। শুধু লাঞ্চ–ভাতার হিসাবেই একজন শিক্ষক একজন ব্যাংকারের চেয়ে বছরে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা কম পান। ব্যাংকাররা ইনসেনটিভসহ পাঁচটি বোনাস পান, শিক্ষকেরা পান দুটি। সব মিলিয়ে একজন শিক্ষক ব্যাংকারের তুলনায় বছরে গড়ে ৭০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত কম পান। গৃহঋণের হিসাবে একজন ব্যাংকার এক কোটি টাকার বেশি ঋণ পান, শিক্ষকেরা পান তার তুলনায় নগণ্য পরিমাণ। ‘স্কুল-কলেজ ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’ব্যবস্থায় চাকরি শেষে পেনশনে একজন শিক্ষক অন্যদের তুলনায় ৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা কম পান, এ কথা অধিকাংশই জানেন না। পুরো কর্মজীবনে একজন শিক্ষক একই গ্রেডের অন্যান্য পেশাজীবীর তুলনায়, বিশেষ করে ব্যাংকারদের তুলনায়, প্রায় ৫০ লাখ থেকে শুরু করে কয়েক কোটি টাকা কম পান। মন্ত্রণালয় ও ব্যাংকের কর্মকর্তারা তো বটেই, কর্মচারীদেরও ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহনের ব্যবস্থা থাকলেও শিক্ষকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহনের কোনো ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে এমন অনেক সুবিধা হয় নেই, নয়তো অত্যন্ত সীমিত।
এখানে প্রশ্নটি ব্যাংকারদের সুবিধা কমানোর নয়, প্রশ্নটি গ্রেডভিত্তিক সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধানের। কেউ ব্যাংকে কাজ করে মানুষের অর্থনৈতিক লেনদেন পরিচালনা করেন। আর শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষটিকে, যিনি ভবিষ্যতে ব্যাংকার, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, প্রশাসক, বিজ্ঞানী কিংবা রাজনীতিবিদ হবেন। তাহলে শিক্ষককে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কেন্দ্রে রাখা হবে না কেন?
শিক্ষকের আর্থিক বঞ্চনার সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত করা জরুরি: নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা। শিক্ষকের ওপর হামলা হলে শুধু একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হন না, আক্রান্ত হয় শ্রেণিকক্ষের কর্তৃত্ব, শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা এবং শিক্ষাব্যবস্থার শৃঙ্খলা।
একই গ্রেডের অন্যান্য চাকরিজীবীর মতো শিক্ষকেরা অর্জিত ছুটি, লাঞ্চ–ভাতা, বিপুল অঙ্কের গৃহঋণ এবং গাড়ি, বাইক ও ল্যাপটপ ক্রয়ের সুবিধা পান না, পরিবহনসুবিধাও সীমিত। অথচ একই দেশে, একই মুদ্রায়, একই বাজারব্যবস্থায় জীবনের অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন তাঁদেরও মেটাতে হয়। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকের বেতন কম্পিউটার অপারেটরের সমান, কলেজ অধ্যাপকের বেতন যুগ্ম সচিবেরও নিচে। এর ওপর সময়মতো পদোন্নতিও যদি না জোটে, তাহলে শিক্ষকতাকে দ্বিতীয় শ্রেণির পেশা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, এমন ভাবা অমূলক নয়।
তবু শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনায় সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোও স্বীকার করা জরুরি। শিক্ষকতাকে ‘নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’ ঘোষণা কিংবা ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট হওয়ার কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা শিক্ষকদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত, ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক তৎপরতা প্রমাণ করে, সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্যাপন নীতিমালা ২০২৬’ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্তরের ১০০ জন গুণী শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে। এর আগে জাতীয় পর্যায়ে এই সম্মাননা পেতেন ১২ জন শিক্ষক, এবার সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হয়েছে। প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে। সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য।
শিক্ষক দিবস আসে, শিক্ষক দিবস যায়। সরকার আসে, সরকার যায়। রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়, নীতির ভাষা বদলায়। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি একই বেতনকাঠামো, একই পদোন্নতির জট, একই আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং একই সামাজিক অবমূল্যায়ন নিয়ে অবসরে যান, তাহলে শিক্ষক দিবসের উদ্যাপন শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতার বেশি কিছু থাকে না।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই বিশ্বাস করে শিক্ষক জাতি গঠনের কারিগর, তাহলে সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে। সেই সঙ্গে নিচের প্রশ্নগুলোর সদুত্তর মেলা প্রয়োজন:
একজন প্রাথমিকের শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনে কতবার পদোন্নতি পাবেন?
একজন মাধ্যমিকের শিক্ষক সর্বোচ্চ কোন গ্রেডে যেতে পারবেন?
একজন কলেজশিক্ষক কোন গ্রেডের অধ্যাপক হয়ে অবসর নেবেন?
একজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা কেন একই বিসিএস ব্যাচের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তার তুলনায় এত দীর্ঘ সময় পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকবেন?
একজন শিক্ষক গবেষণা করবেন কী দিয়ে?
ডিজিটাল শিক্ষা দেবেন কোন ডিভাইসে?
আর শ্রেণিকক্ষে অপমানিত বা আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র তাঁর পাশে কত দ্রুত দাঁড়াবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে শিক্ষক দিবসে আমরা শিক্ষককে কতটা মর্যাদা দিই। কারণ, শিক্ষকের মর্যাদা বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেই দৃশ্যমান হতে হয়।
তাই এবার শিক্ষক দিবসে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে শিক্ষকেরা আর্থিকভাবে কেমন আছেন। প্রশ্নটি হলো, শিক্ষকদের এমন অবস্থায় রেখেই কি আমরা সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব?
* সচিব তালুকদার: শিক্ষক ও লেখক