রঙে, গানে, গল্পে রাঙানো এক শ্রাবণ দিন

রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ সেদিন সেজেছিল অন্য রকম এক আয়োজনে। শিশু আর কিশোরদের জন্য বছরের পর বছর ধরে চেনা একঘেয়ে ছুটির দিনগুলোর ভিড়ে এবার এসেছিল ব্যতিক্রম কিছু, নাম তার ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। উৎসবটির আয়োজক প্রতিষ্ঠান জলছবি। উৎসবটির অ্যাসোসিয়েট পার্টনার হিসেবে রয়েছে দৈনিক প্রথম আলো ও ম্যাগাজিন পার্টনার হিসেবে রয়েছে কিশোর আলো।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো চত্বরে ছিল রংতুলি, ছড়ার সুর, মাটির স্পর্শ আর গানের মূর্ছনা। অভিভাবকেরা সন্তানের হাত ধরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক আয়োজন থেকে আরেক আয়োজনে, আর শিশুরা খুঁজে নিয়েছে নিজেদের মতো করে আনন্দের ঠিকানা।

সকালে উদ্বোধনী পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কার্যক্রম। এরপর একে একে মঞ্চে আসে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আর আবৃত্তির আসর। রংপেনসিল হাতে নিয়ে ছোট্ট শিল্পীরা কাগজে ফুটিয়ে তুলছিল নিজের কল্পনার জগৎ, তারপর কণ্ঠের মূর্ছনায় কবিতার লাইনগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছিল আরেক দল শিশুর গলায়। সৃজনশীলতার এই দুই ধারা মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক অন্য রকম উৎসবের আবহ। একই সময়ে চলছিল উদ্যোক্তাবিষয়ক একটি কর্মশালা, যেখানে ভবিষ্যতের স্বপ্নবাজদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয় নতুন কিছু গড়ে তোলার প্রাথমিক পাঠ।

দিনের সবচেয়ে আলোচিত পর্বটি ছিল অভিযাত্রী হোমায়েদ ইসহাক মুনের ভ্রমণকথা। এভারেস্ট জয়ের পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা, পর্বতচূড়ায় ওঠার সেই দুঃসাহসিক মুহূর্তগুলো আর আয়রনম্যান সেভেন্টি পয়েন্ট থ্রি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার গল্প যখন তিনি বলছিলেন, তখন উপস্থিত শিশু–কিশোরদের চোখে ফুটে উঠছিল বিস্ময় আর অনুপ্রেরণার এক মিশ্র অনুভূতি। সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার সেই গল্প অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছিল দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শিশুদের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল মাটির কাজের কর্মশালা, যেখানে হাতে কাদামাটি মেখে তারা গড়ে তুলেছে নিজেদের প্রথম ভাস্কর্য। এক কোণে চলছিল জলপুতুল পুতুলনাচের পরিবেশনা, যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রেখেছিল ছোট্ট দর্শকদের। বিকেল গড়াতেই মঞ্চ জমে ওঠে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়। ওডিসি নৃত্যদলের নাচ দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে দীর্ঘক্ষণ। এরপর একে একে গান নিয়ে আসেন কনক আদিত্য ও আসির আরমান, আর আকিব হুসাইনের ব্যান্ড দ্য কিংস। তাঁদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা দিয়ে জমিয়ে তোলে সন্ধ্যার আসর। উপস্থিত দর্শকশ্রোতারা তাল মিলিয়েছেন গানের সঙ্গে, ভুলে গিয়েছেন সময়ের হিসাব। জলছবির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ছিল গান, নাচ, আবৃত্তি এবং নাটক। জলছবির অভিনয় ও আবৃত্তির তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ব্যাচ সমাপনী প্রযোজনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’ ও চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ব্যাচ সমাপনী প্রযোজনা কাজী নজরুল ইসলামের ‘লিচু চোর’ নাটক দুটি মঞ্চস্থ করা হয়।

দিনের শেষভাগে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। হাসিমুখে পুরস্কার নিতে আসা শিশুদের চোখে তখন ফুটে উঠছিল গর্ব আর আনন্দের মিশেল। সৃজনশীলতা লালনের যে প্রত্যয় নিয়ে এই আয়োজনের সূচনা, তার সার্থক পরিসমাপ্তি ঘটে এই পুরস্কার বিতরণীর মধ্য দিয়ে। অংশগ্রহণকারী শিশু, তাদের অভিভাবক আর আমন্ত্রিত অতিথিদের স্মৃতিতে শ্রাবণ মেঘের দিন ২০২৬ থেকে যাবে দীর্ঘদিন এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে।