শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক আলোচনায় আলোচককে অভ্যর্থনা
শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক আলোচনায় আলোচককে অভ্যর্থনা

জীবনের কথা

শিক্ষায় ক্রমোন্নতি, আর ছন্দপতনে ঘুরে দাঁড়ানো

বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—এ তিনটি স্তরেই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রকমের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার কারণে অগ্রগতিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অনেকেই বিপথগামী হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই বিপথগামী হওয়াটা সামষ্টিকভাবে দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যথোপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, গুণগত শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে প্রতিনিয়ত অবহিত করে তাদের সঠিক পথে ধরে রাখাটা প্রত্যেক শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।

শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বড় ধরনের স্বপ্নের জাল বুনে আশার আলোকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দিকনির্দেশনাসহ কথা বলা ও সেমিনার দেওয়াটা একটা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ। বিপথগামী না হতে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে আসার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক চেষ্টায় প্রেরণা জোগানোর জন্য যে কারও স্বেচ্ছায় শ্রম দেওয়াটা সমাজ তথা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী হলেও একজন সচেতন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বহু বছর আগে থেকেই ছুটিতে এসে দেশের মাটিতে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে স্বেচ্ছায় শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করাটা আমার একটা নেশা। বাংলাদেশ, জাপান, কানাডা ও আমেরিকায় শিক্ষা, গবেষণা ও বসবাসসহ বিভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা থেকে দেশীয় শিক্ষার্থী ও দেশীয় যুবসমাজের অপার সম্ভাবনা কিংবা মারাত্মক অবক্ষয়ের বিষয়গুলো বহির্বিশ্বের সঙ্গে বিশেষভাবে পার্থক্য দেখি।

২.

দেশে শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা, অন্য কথায় সফলতার পথে ছন্দপতনের কারণগুলো খুঁজলে যা পাওয়া যায় সেগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো—ক. যোগ্য শিক্ষকের অভাব, খ. শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি, গ. অভিভাবকের অবহেলা, ঘ. মোটিভেশন বা প্রেরণার অভাব, ঙ. স্মার্টফোন, চ. ফেসবুক, ছ. কৈশোরে শারীরিক পরিবর্তন, জ. অসৎ সঙ্গ, ঝ. মাদক এবং ঞ. পারিবারিক অসচ্ছলতা।

শিক্ষাঙ্গনে যোগ্য শিক্ষকের অভাব ও রাজনীতি—এ দুটি বিষয় মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমস্যা এবং তবে কলেজগুলোতেও এ সমস্যা কম নয়। প্রথম আলোতে প্রকাশিত (২৪ জানুয়ারি ২০২১) একটা লেখা ‘আনুগত্য আর অনিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ’। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে কী বেহাল দশা, সেসব বিষয় তথ্যসূত্রসহ চিত্রিত আছে এতে। এখন ২০২৬ সাল। দেশের কেন্দ্রীয় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো মূলত মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থীদেরই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে! কী আফসোসের বিষয়! কতটা হতভাগ্য জাতি আমরা, উন্নত বিশ্বে এটা অসম্ভব। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা চাওয়া হয় পিএইচডি ও উন্নত গবেষণার অভিজ্ঞতা। দেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের চিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি উন্নত হবে, তা নয়। মাস্টার্স পাস করা এসব শিক্ষক নিয়োগের অল্প পরই উচ্চতর শিক্ষা পিএইচডি ও গবেষণার জন্য ছুটিতেও যাবেন, বিদেশে গিয়ে কেউ কেউ আর ফিরেও আসবেন না। অথচ তাঁদের বেতন বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, টাকা ফেরত দিতেও দীর্ঘকাল গড়িমসি করবেন। উচ্চশিক্ষা শেষে যাঁরা ফিরে আসবেন, অনেকেই উন্নত বিশ্বে দেখা শিক্ষার পরিবেশ ভুলে ক্ষমতার রাজনীতিতে আগ্রহী হবেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের মূল বিষয় শিক্ষা ও গবেষণা মুখ্য হওয়ায় পরিবর্তে গৌণ বিষয়ে পরিণত হবে। গুণগত শিক্ষার অভাবে শিক্ষার্থীরা হবে বঞ্চিত, আর গবেষণার মানোন্নয়ন না হওয়ার দোষ চাপানো হবে আর্থিক সংকটকে।

উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতি নেই। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দেশে শিক্ষকেরা মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার চর্চা করেন। শিক্ষার্থীবান্ধব বিষয়গুলোতে শিক্ষকদের অমনোযোগিতা স্পষ্ট দেখা যায়। প্রবাসী গবেষকদের কেউ কেউ তাঁদের বিষয়ভিত্তিক সেমিনার দিতে আগ্রহের কথা জানিয়ে দেশে আসেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সেমিনারের সময় সেখানে বেশির ভাগ শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন। এতে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে তাঁদের অবহেলা ও অনাগ্রহ আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ চিত্র নিজের চোখে দেখেছি।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

উন্নত বিশ্বে মূলধারার রাজনীতির কোনো অঙ্গসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। সেখানে শিক্ষার্থীর কাজ হলো লেখাপড়া করা, গবেষণা করা, শিক্ষককে প্রশ্ন করা, নিজ নিজ বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করা এবং কর্মক্ষেত্রের জন্য নিজেদের প্রস্তুতিকরণ। রাজনৈতিক নেতার গাড়ির পেছনে বা পাশাপাশি দৌড়ানো, রাজনৈতিক আড্ডাবাজি, রাজনীতির গণরুম গেস্টরুম কালচার, অস্ত্রের ঝনঝনানি, গোলাগুলি, মারামারি, ভিন্নমতের মানুষকে আক্রমণ এগুলো উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় না। ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সবচেয়ে বড় ব্যাধি!

৩.

সামাজিক, আর্থিক, পেশাগত ও অসচেতনতা ইত্যাদি সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের সুন্দরভাবে বড় করায় অপারগ। পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সফল অনেক অভিভাবক সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেন না, সন্তানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎসাহ দেন না, জীবনসংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় সন্তানদের অবহিত করেন না, অযাচিতভাবে সন্তানদের প্রচুর অর্থ দিয়ে খরচের বিষয় তদারকি করেন না, কেউ কেউ স্নেহমাখা আচরণও করেন না। অসচ্ছল ও অশিক্ষিত অভিভাবকের কাছে সন্তানদের চাওয়াপাওয়া তো সীমিতই। অভিভাবকের অবহেলার ফলস্বরূপ সন্তানদের এগিয়ে চলা বাধাগ্রস্ত হয়, গতিতে হয় ধীর। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাজীবনের বিচ্যুতি হয় ও বখাটেপনায় পদার্পণ ঘটে। তৈরি হয় কিশোর গ্যাং, শুরু হয় ইভ টিজিং, চুরি, ছিনতাই। মোটিভেশন বা প্রেরণা দেওয়ার মানুষের বড়ই অভাব। কিন্তু মোটিভেশন দিয়ে ছন্দপতন হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেককেই সঠিক পথে আনা সম্ভব।

স্মার্টফোন, ফেসবুক, টিকটক, অনলাইন রিল ইত্যাদি বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থী, যুবসমাজ ও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার নষ্ট হওয়ার খুব বড় কারণ। সচ্ছল পরিবার অথবা অসচ্ছল পরিবার সবখানে এখন সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন। স্কুল বাচ্চা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সব স্তরের সন্তানদের হাতে স্মার্ট ফোন। দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সন্তানদের অনেকেই স্মার্ট ফোন হাতে ফেসবুক, টিকটক ও অনলাইন রিল দেখায় আসক্ত, ঠিক মাদকাসক্তের মতো। শিক্ষাজীবনের মূল্যবান সময়কে এসব অনলাইন আসক্তিতে নষ্ট করে শিক্ষার্থীরা ঝরে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যর্থ হচ্ছে।

হাইস্কুল পেরিয়ে কলেজ বয়সী ছাত্রছাত্রীদের জন্য একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির দুটি শিক্ষাবর্ষ অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। খুব অল্প সময়, কিন্তু বিস্তর বড় সিলেবাসের অনেকগুলো বিষয় থাকে শিক্ষার এই স্তর এইচএসসি লেভেলে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে এ বয়সী শিক্ষার্থীদের শারীরিক পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে হরমোনের পরিবর্তন বলে। ছেলেরা ও মেয়েরা নিজেদের ভিন্ন স্কুল অথবা একই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে ভর্তি হয়। এটা টিনএজ বা কৈশোর বয়স, প্রকৃতির নিয়মে ছেলে ও মেয়ে সহপাঠীদের মধ্যে কিছুটা অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো বন্ধুত্ব তৈরি হয়। বাস্তবতা এই যে এসব ভালো লাগা ও বন্ধুত্বের ফলে নিজেদের অপরিকল্পনা ও অসচেতনতায় অনেক ভালো ছাত্রছাত্রীও প্রচুর সময় নষ্ট করে পিছিয়ে পড়ে, পরীক্ষার আশানুরূপ সাফল্য পায় না, কিছু ক্ষেত্রে অকৃতকার্যও হয়। এটাই বাস্তবতা।

অসৎ সঙ্গ ও মাদক অত্যন্ত ভয়ানক এ দুটি কারণে দেশে শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের মারাত্মক অধঃপতন পরিলক্ষিত হয়। এটা উন্নত বিশ্বেও কিছুটা হয়, তবে কাউন্সেলিং ও মোটিভেশনের প্রচুর চেষ্টা চলে। একজন শিক্ষার্থীর যদি পাঁচজন ভালো বন্ধু থাকে, সেই বন্ধুরা যদি ভালো হয় এই শিক্ষার্থীও ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু বন্ধুরা যদি খারাপ স্বভাবের উরাধুরা হয় এই শিক্ষার্থীও সে রকমই হবে। এ জন্য বন্ধু সিলেকশন করতে বেশ খেয়াল রাখা প্রয়োজন, অভিভাবককেও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। নিম্ন আয়ের দেশে পারিবারিক অসচ্ছলতার গল্প সবখানে, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সুন্দর পরিকল্পনা ও প্রচুর পরিশ্রম দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক আয় ব্যয়ের সঠিক পরিকল্পনা, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, শিক্ষার্থীদের সাম্য অধিকার নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে অসচ্ছলতায় শিক্ষার্থীর সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণ পাওয়া যাবে।

৪.

বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে অগণিত মানুষের মতো আমার জন্মও প্রত্যন্ত এক গ্রামে। টেলিফোন-টেলিভিশন ছাড়া বিদ্যুৎহীন ভুতুড়ে পরিবেশে নিম্নমানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গাছের ছায়ায় মাটিতে বসে প্রায় দুই বছর অক্ষরজ্ঞান ও সংখ্যাজ্ঞান শিখেছি, পরে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত টিনের চালের শ্রেণিকক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছি। তবে মা-বাবা প্রতিদিন একইভাবে দুটা বাক্য বলে আজীবনের জন্য শিখিয়েছেন, তা হচ্ছে ক. অসৎসঙ্গ না নিয়ে ভালোদের সঙ্গে মিশতে হবে এবং খ. ভালোমতো লেখাপড়া ও পরিশ্রম করতে হবে।

চড়াই–উতরাই পেরিয়ে হাইস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সব স্তরের কোর্স সম্পন্ন হয়েছে। উন্নত বিশ্বের দুটি ভিন্ন দেশে খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রসায়নে পিএইচডি ও পোস্টডক করারও সৌভাগ্য হয়েছে। বাংলাদেশ, জাপান, কানাডা, ও আমেরিকায় চারটি দেশেই পেশাগত কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, এগুলো মূলত রসায়নের উচ্চতর গবেষণাধর্মী কাজ। উন্নত বিশ্বে হাজারো উচ্চশিক্ষিত ও গবেষণাকাজে জড়িত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। এসব হাজারো মানুষের ও তাদের দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জীবনের গল্প শুনি। সেসব বিষয় বাংলাদেশের ব্যবস্থার সঙ্গে মিল-অমিল ও পার্থক্য খুঁজে পাই।

ছুটিতে দেশে ফিরে আমি ছুটে যাই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসহ বিভিন্ন স্কুলে। এগুলো আলমা ম্যাটার ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হাইস্কুল শিখিয়েছে জীবনযুদ্ধে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকার কৌশল। কলেজ শিখিয়েছে অসচেতনতায় অসফলতার নিম্ন স্থান থেকে কীভাবে ফিরে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। আর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় শিখিয়েছে সামাজিকতা, বন্ধুত্ব, নেটওয়ার্কিং, আত্মনির্ভরশীলতা ও বুদ্ধিমত্তা। আলমা ম্যাটার এসব প্রতিষ্ঠানে বহু ঋণ আছে। তাই দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, পেশাগত জীবন, সামাজিক জীবন, ব্যর্থতা ও সফলতার সব অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে এসব প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছায় গিয়ে সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য সেমিনার দেয়, মোটিভেশনাল স্পিচ দেয় কিংবা ক্লাস করায়।

৫.

বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা অথবা সফলতার পথে ছন্দপতনের কারণগুলোকে আমলে নিয়ে সেমিনার বা ক্লাসে উপস্থিত অডিয়েন্স অনুযায়ী পরামর্শ দিয়ে প্রেরণা জোগানো দরকার। নিচে এ লেখনীতে শিক্ষার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় উপসংহার হিসেবে সংযোজিত হলো।

ড্রিম, ভিশন ও পজিটিভ মাইন্ড সেট তিনটা ভিন্ন বিষয়। ড্রিম বা স্বপ্ন হলো জাগতিক জীবনে বিশেষ কোনো কিছুতে আন্দোলিত হয়ে খুব ব্যতিক্রমী কিন্তু সহজ বা কঠিন কিছু হতে চাওয়া বা কিছু করতে চাওয়া, অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে বিষয়ে পর্যাপ্ত চেষ্টা করা হয় না। জীবনের ভিশন বা টার্গেট অথবা এইম হলো ভালো লাগা কোনো বিশেষ বিষয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া এবং এ ব্যাপার যথোপযুক্ত চেষ্টা করা, এতে সফলতা আসবে, সফলতা না এলেও ভালো কিছু সম্ভব। কিন্তু পজিটিভ মাইন্ড সেট হলো কোনো কিছুতে সফলতা না এলেও শক্ত মানসিকতায় এগিয়ে যাওয়া, এতে জীবনের ভিশন থেকেও বড় কিছু অর্জিত হতে পারে।

সফলতা পেতে কন্টিনিউয়াস ইম্প্রুভমেন্ট বা প্রতিনিয়ত উন্নতি মুখ্য বিষয়। এর মানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিয়ত উন্নতির জন্য লেগে থাকা। মানুষের জীবনে ক্রমোন্নতির ছন্দপতন হতে পারে, এমনকি ব্যর্থতাও আসে। কিন্তু ছন্দপতন বা ব্যর্থতা থেকে শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই আসল বিষয়। সেলফ মোটিভেশন, সেলফ টিচিং ও সেলফ কন্ট্রোল—এগুলো দিয়ে সফলতা আসবে। ব্যর্থতা থেকে শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পগুলো খুব বেশি আকর্ষণীয় হয়। প্রচণ্ড দারিদ্র্য কিংবা চরম সংকটময় সীমাবদ্ধতাকে আলিঙ্গন করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া অতি সম্মানের, আর অত্যন্ত কৃতিত্বের বিষয়। শিক্ষার্থীদের এ বিষয়গুলোই মনে রাখা দরকার। বিপথগামী না হয়ে পড়ার টেবিলে ফিরে আসতে হবে। শিক্ষার্থীর পড়ার টেবিলে রাখা আছে তার আগামীর স্বপ্ন।

*লেখক: মো. সাদেকুল ইসলাম, পিএইচডি, লিড সায়েন্টিস্ট, অর্গানিক কেমিস্ট্রি, পেনসালভানিয়া, আমেরিকা