
একটি আন্তর্জাতিক ডিগ্রি, বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখা—কোনটি আপনার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে? যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ নয়; বরং নিজের দক্ষতা বাড়ানো, পেশাজগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়ারও সুযোগ। তবে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচনের পাশাপাশি পড়াশোনার সময় থেকেই পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ে শুধু র্যাঙ্কিং নয়
যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের সময় শুধু বিশ্ব র্যাঙ্কিং বা পরিচিত নামের দিকে তাকালে চলবে না। নিজের পছন্দের বিষয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ভালো, সেখানে কী শেখানো হয়, ব্যবহারিক কাজ বা ইন্টার্নশিপের সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি। একই বিষয়ের নাম এক হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে কোর্সের কাঠামো, পড়ানোর পদ্ধতি ও বিশেষায়নের সুযোগ আলাদা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে কোর্সের বিস্তারিত, ভর্তির যোগ্যতা, মূল্যায়নপদ্ধতি, শিক্ষক ও গবেষণার ক্ষেত্র সম্পর্কে জানা যায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন, একাডেমিক সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও ক্যারিয়ার পরামর্শের ব্যবস্থা আছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে জীবনযাত্রার ব্যয়ও এক রকম নয়। তাই টিউশন ফির সঙ্গে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বাজেট তৈরি করতে হবে। কোর্স ও বৃত্তির তথ্য খুঁজতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্টাডি ইউকে ওয়েবসাইট কাজে লাগতে পারে।
যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি ও পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ করে দিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। এ সম্পর্কে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ক্যাম্পেইন মার্কেটিং ম্যানেজার (এশিয়া প্যাসিফিক) মুতাম্মীম আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইংরেজি ভাষার কোর্স, আইইএলটিএস প্রস্তুতি ও পরীক্ষা আয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচন, বৃত্তি এবং প্রি-ডিপার্চার গাইডেন্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে ব্রিটিশ কাউন্সিল। আইইএলটিএস পরীক্ষার ফল সাধারণত দুই দিনের মধ্যে পাওয়া যায়।’
মুতাম্মীম আহমদ আরও বলেন, ‘অ্যালামনাই ইউকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটরা পেশাগত যোগাযোগ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পান। এ ছাড়া স্টাডি ইউকে অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ডসের মাধ্যমে সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা গ্র্যাজুয়েটদের স্বীকৃতিও দেওয়া হয়।’
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ
যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগও রয়েছে। তবে কাজের অনুমতি নির্ভর করে শিক্ষার্থীর ভিসার শর্ত, কোর্স ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরনের ওপর। সাধারণত ডিগ্রি পর্যায়ের পূর্ণকালীন কোর্সে অধ্যয়নরত যোগ্য শিক্ষার্থীরা ক্লাস চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন; ছুটির সময়ে পূর্ণকালীন কাজের সুযোগও থাকতে পারে। তবে নিজের ভিসার শর্ত যাচাই না করে কাজ শুরু করা উচিত নয়।
খণ্ডকালীন কাজের সুযোগের মধ্যে দোকান, রেস্তোরাঁ, গ্রাহকসেবা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সহকারী হিসেবে কাজ থাকতে পারে। তবে কাজ পাওয়া নিশ্চিত নয়। তাই পড়াশোনার খরচ মেটানোর একমাত্র উপায় হিসেবে খণ্ডকালীন চাকরির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
শুধু চাকরি করলেই ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয় না। কোর্সের সঙ্গে সম্পর্কিত ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবা, গবেষণা, দলগত প্রকল্প কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ কাজের সুযোগ খুঁজতে হবে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে নিজের কাজের নমুনা, পেশাগত যোগাযোগ ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যারিয়ার পরামর্শ ও কর্মসংস্থান প্রস্তুতির বিভিন্ন সহায়তাও পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিটিশ কাউন্সিলের হায়ার এডুকেশন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সরকার আসিফ ইকবাল প্রথম আলোকে জানান, ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নতুনভাবে চিন্তা করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং পেশাগত সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ দেয়।’ তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায়, ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন (টিএনই) পদ্ধতিতে বাংলাদেশে থেকেই কর্মজীবনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নিজের লক্ষ্য, আর্থিক সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী কোর্স বাছাই এবং ডিগ্রির স্বীকৃতি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন সরকার আসিফ ইকবাল। এর পাশাপাশি যোগাযোগ, বিশ্লেষণী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করা এবং নিয়মিত নতুন কিছু শেখার মানসিকতা ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি শুরু হোক পড়াশোনাকালীনই
আন্তর্জাতিক কর্মজগতে শুধু ভালো ফল নয়, নিজের দায়িত্ব ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করা, তথ্য বিশ্লেষণ, সময় ব্যবস্থাপনা ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্লাসের বাইরের সুযোগগুলো কাজে লাগানোর পাশাপাশি নিজের অর্জনগুলো নথিবদ্ধ করা উচিত। কোন প্রকল্পে কাজ করেছেন, কী সমস্যা সমাধান করেছেন এবং সেই কাজে আপনার অবদান কী ছিল—এসব তথ্য ভবিষ্যতে জীবনবৃত্তান্ত ও চাকরির সাক্ষাৎকারে কাজে আসবে।
পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যে থাকতে বা কাজ করতে চাইলে তখনকার অভিবাসন নীতিমালা ও নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী ভিসার পথ যাচাই করতে হবে। আবার দেশে ফিরে কিংবা অন্য দেশে কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও ডিগ্রির স্বীকৃতি, পেশাভিত্তিক যোগ্যতা ও নিয়োগদাতাদের চাহিদা সম্পর্কে আগে থেকে জানা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের ডিগ্রি সুযোগ তৈরি করতে পারে কিন্তু বৈশ্বিক ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা নয়। সুযোগগুলো কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি।