ঢাকা শহরে বাচ্চাদের স্কুলে কেন বাবা-মা যান বা গাড়ি পাঠান। উত্তরটা খুব সহজ। বেশির ভাগই পাঠান বা সঙ্গে যান নিশ্চিন্তে সন্তান স্কুলে গেল বা এল কি না। আসলে নিশ্চিন্ত থাকতে চান সন্তানের বিষয়ে। এটাই মোটাদাগে বড় কারণ। বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
বিগত এক দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতা করার জন্য আমার অভিজ্ঞতা বলে রাজধানী ঢাকার যানজট নতুন কিছু নয়। এটি এখন নগরবাসীর জীবনের একটি স্বাভাবিক দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল চলাকালীন যে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, তা শুধু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য নয়, বরং পুরো নগরীর ট্রাফিকব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীকে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি অবশ্যই একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন ধরে দৃশ্যমান একটি সমস্যার সমাধানে এখনো কেন আমরা বিকল্প খোঁজার পর্যায়েই আছি?
বাস্তবতা হলো, এ সমস্যা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নগর পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। স্কুলভিত্তিক পরিবহননীতিও সুসংগঠিতভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিদিন সকালবেলা একই সময়ে হাজারো শিক্ষার্থী যখন রাস্তায় নামে, তখন একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
অনেকে ১৫০ শিক্ষার্থীর জন্য ১০০টি গাড়ির উদাহরণটি সমস্যার একটি চিত্র তুলে ধরেন। কিন্তু এই চিত্রের পেছনের কারণগুলো নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। অভিভাবকেরা কি অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন, নাকি তাঁরা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্পের অভাবে বাধ্য হচ্ছেন? যদি স্কুলবাস ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হয়, যদি গণপরিবহন শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান কতটা বাস্তবসম্মত?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশগত প্রভাব। স্কুলের সময় অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার শুধু যানজটই বাড়ায় না, বরং বায়ুদূষণও বাড়ায়। একই স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে শত শত গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকলে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুল এলাকার বায়ুদূষণ শিশুদের শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদি স্কুলভিত্তিক পরিবহন পরিকল্পনা, কারপুলিং এবং গণপরিবহন ব্যবহার বাড়ানো যায়, তাহলে শুধু যানজটই কমবে না, বরং নগরের পরিবেশগত চাপও কমবে। তাই এ সমস্যাকে শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে না দেখে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত না করে শুধু উপসর্গ নিয়ে কাজ করলে স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায় না।
বিশ্বের অনেক শহর এ সমস্যাকে একটি নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। উদাহরণ হিসেবে জাপানের শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাঁটা বা গণপরিবহন ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য নিরাপদ পথ ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে স্কুল পরিবহন একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে স্কুলগুলো পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে স্কুলের সময়সূচি ভিন্ন করার মাধ্যমে ট্রাফিক চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লন্ডনে ‘স্কুল স্ট্রিট’ উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল এলাকার সড়কগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—সমস্যাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ঢাকায় এখনো এ ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির অভাব স্পষ্ট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। একটি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দিয়ে এই সমস্যার সমাধান আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
এখানে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি শিক্ষার্থী থাকলে সেই স্কুলকে নিজস্ব বা সমন্বিত বাসব্যবস্থার পরিকল্পনা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একই এলাকায় অবস্থিত স্কুলগুলোর সময়সূচি ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে একই সময়ে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, কারপুলিং বা যৌথ পরিবহনব্যবস্থাকে নীতিগতভাবে উৎসাহিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা যেতে পারে।
চতুর্থত, স্কুল এলাকার জন্য বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। নির্দিষ্ট ড্রপ-অফ পয়েন্ট, স্বল্প সময়ের পার্কিং এবং কঠোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
পঞ্চমত, দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থাকে শিক্ষার্থীবান্ধব করা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে অনেক অভিভাবকই ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হিসেবে গণপরিবহন বিবেচনা করবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সমস্যাকে প্রশাসনিক নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সমস্যার ক্ষেত্রেই উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এই উদ্যোগও যদি একই পরিণতির দিকে যায়, তাহলে তা কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবেই থেকে যাবে।
ঢাকার যানজট একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এর সমাধানও বহুমাত্রিক হতে হবে। প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা।
সমস্যার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাগরিকদের জন্য তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ফলাফল। এখন প্রশ্ন একটাই এই নির্দেশনা কি বাস্তব পরিবর্তনের দিকে যাবে, নাকি এটি কেবল সমস্যার পুনরাবৃত্ত স্বীকৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেটাই দেখার বিষয়। তবে সমন্বিত একটি বাস্তবধর্মী সমাধান আসলে সেটি সবার জন্যই ভালো হবে।
লেখক: সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যায়নরত।